অনুবাদকের ভূমিকা
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে উসাইমিন রহিমাহুল্লাহর “রিসালাতু ফীল ক্বদর” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রিসালাহ যেখানে তাকদির সংক্রান্ত সঠিক আকীদা অত্যন্ত সহজ ও সুস্পষ্টভাবে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাভাষী মুসলিমদের কাছে এই মূল্যবান রিসালাহটি পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এটি বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং পাঠকদের জন্য উপকারী করুন। আমিন
– সাফিন চৌধুরী
তাকদির সংক্রান্ত সঠিক আকীদা — কুরআন, সুন্নাহ ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আলোকে
তাকদির কি এবং কেন এটি আলোচনা করা প্রয়োজন?
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য আমরা তাঁরই প্রশংসা করি তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি তাঁরই কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁরই দিকে ফিরে আসি আর আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই আমাদের আত্মার অনিষ্টতা থেকে এবং আমাদের মন্দ কর্মসমূহের কুফল থেকে। আল্লাহ যাকে পথ দেখান তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাঁকে কিয়ামতের পূর্বে সুসংবাদদাতা সতর্ককারী এবং তাঁরই অনুমতিক্রমে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি রিসালাত পৌঁছে দিয়েছেন আমানত আদায় করেছেন উম্মাহকে উপদেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহর পথে যথার্থ জিহাদ করেছেন যে পর্যন্ত না তাঁর কাছে নিশ্চিত মৃত্যু উপস্থিত হয়েছে। আল্লাহর অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর ওপর তাঁর পরিবারবর্গের ওপর তাঁর সাহাবাগণের ওপর এবং যারা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত ইহসানের সাথে তাঁদের অনুসরণ করবে তাদের সবার ওপর। অতঃপর এই বিষয়ে বলছি।
হে সম্মানিত ভ্রাতৃবর্গ আমরা এই মজলিসে সমবেত হয়েছি যেখানে আমরা আশা করি আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও রহমতের ভাণ্ডার থেকে দ্বার উন্মুক্ত করে দেবেন এবং আমাদেরকে সুপথপ্রাপ্ত পথপ্রদর্শকদের অন্তর্ভুক্ত করবেন সংস্কারক নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং উপকৃত শ্রোতাদের অন্তর্ভুক্ত করবেন। আমরা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বসেছি যা সকল মুসলিমের জন্যই প্রাসঙ্গিক আর তা হলো আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদির। মূল বিষয়টি আলহামদুলিল্লাহ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন উত্থাপন যেহেতু বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে এবং অনেক মানুষের কাছে বিষয়টি জটিল ও অস্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে আর বহু মানুষ এই বিষয়ে কখনো সত্যের সাথে কখনো বা বাতিলের সাথে আলোচনায় লিপ্ত হয়েছে এবং যেহেতু মনগড়া প্রবৃত্তির অনুসরণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ও বেড়ে গিয়েছে এমনকি পাপী ব্যক্তি তাকদিরের দোহাই দিয়ে নিজের পাপাচারকে জায়েজ সাব্যস্ত করতে চাইছে কাজেই এইসব এবং এতদ্ব্যতীত অন্যান্য কারণ যদি না থাকত তাহলে আমরা কখনোই এ বিষয়ে আলোচনা করতে আসতাম না।
তাকদির নিয়ে বিতর্ক করা থেকে নবী ﷺ-এর সতর্কবাণী
আর কদর ও তাকদিরের ব্যাপারে প্রাচীন ও আধুনিক যুগে সর্বদাই উম্মাহর মধ্যে মানুষের মতভেদ লালিত হয়ে আসছে। বর্ণিত আছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার সাহাবাগণের নিকট বের হয়ে এলেন তখন তারা তাকদিরের ব্যাপারে তর্ক বিতর্কে লিপ্ত ছিলেন। তিনি তাদেরকে সে কাজ থেকে নিষেধ করলেন এবং জানিয়ে দিলেন যে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহকে ধ্বংস করার পেছনে এই বিতর্ক ছাড়া আর কিছুই দায়ী ছিল না।[1]হাদীসটি তিরমিযীর কিতাবুল কদর অধ্যায়ে তাকদির নিয়ে বিতর্কে কঠোরতা … Continue reading
তাকদির ও আল্লাহর প্রভুত্বের সম্পর্ক — তাওহিদের তিন প্রকার
কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দা ও সালফে সালেহীনের জন্য জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন যারা তাঁদের জ্ঞান ও কথাবার্তায় ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায়নিষ্ঠ পথ অবলম্বন করেছিলেন। আর তা এই যে আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত ও তাকদির বিষয়টি সৃষ্টিজগতের প্রতি তাঁর রবুবিয়াত বা প্রভুত্বের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এটি তাওহিদের সেই তিন প্রকারের এক প্রকারের অংশ যেগুলোতে আলেমগণ আল্লাহর তাওহিদকে বিভক্ত করেছেন।
প্রথম প্রকার উলুহিয়্যাহর তাওহিদ অর্থাৎ ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলাকে একক ও অদ্বিতীয় মনে করা। দ্বিতীয় প্রকার রবুবিয়্যাহর তাওহিদ অর্থাৎ সৃষ্টি রাজত্ব ও পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলাকে একক মনে করা। তৃতীয় প্রকার নাম ও গুণাবলির তাওহিদ অর্থাৎ আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলির ক্ষেত্রে তাঁকে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকার করা।
তাই তাকদিরের প্রতি ঈমান আনা আল্লাহর রবুবিয়াত বা প্রভুত্বেরই অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহু তাআলা বলেছেন কদর বা তাকদির হলো আল্লাহর কুদরাত বা ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। কেননা নিঃসন্দেহে তা তাঁরই কুদরাত ও ব্যাপক ক্ষমতার অংশ। আর এটি আল্লাহ তাআলার সেই গোপন রহস্য যা তিনি নিজেই আবৃত রেখেছেন যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। তা লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ রয়েছে সেই সুসংরক্ষিত কিতাবে যার প্রতি কারো দৃষ্টি পড়ে না। আর আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতে কী নির্ধারণ করে রেখেছেন তা আমরা ঘটনা ঘটার পরে অথবা সে বিষয়ে সত্যবাদী সংবাদ পাওয়ার আগে জানতে পারি না।
তাকদির বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ তিনটি দলে বিভক্ত
হে ভ্রাতৃবৃন্দ তাকদিরের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
প্রথম ভ্রান্ত দল — জবরিয়া: বান্দার ইচ্ছাশক্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকারকারী
প্রথম দল তাকদির সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে এবং বান্দার নিজস্ব ক্ষমতা ও স্বাধীন ইচ্ছাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছে। তারা বলে থাকে বান্দার কোনো ক্ষমতা নেই কোনো ইচ্ছাশক্তি নেই বরং সে সম্পূর্ণরূপে পরিচালিত কখনোই স্বাধীন নয় যেমন বাতাসের স্রোতে কাত হওয়া গাছের মতো। তারা বান্দার ইচ্ছাধীন কৃতকর্ম এবং অনিচ্ছাধীন কর্মের মধ্যে কোনো পার্থক্যই নিরূপণ করে না।
নিঃসন্দেহে এই দলটি পথভ্রষ্ট। কেননা ধর্ম বুদ্ধি ও সাধারণ অভিজ্ঞতার নিরিখে এটি একটি প্রাথমিক জ্ঞান যে মানুষ স্বেচ্ছাকৃত কর্ম ও বাধ্যতামূলক কর্মের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য অনুভব করে ও বুঝতে পারে।
দ্বিতীয় ভ্রান্ত দল — কদরিয়া: আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টিকে অস্বীকারকারী
দ্বিতীয় দল বান্দার ক্ষমতা ও স্বাধীন ইচ্ছাকে সাব্যস্ত করতে গিয়ে চরম বাড়াবাড়ি করেছে। এমনকি তারা বান্দার কর্মের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার কোনো ইচ্ছা মনোনয়ন বা সৃষ্টির সম্পর্ক আছে বলে অস্বীকার করেছে। তারা ধারণা করে যে বান্দা তার কর্মে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র। এমনকি তাদের মধ্যকার একদল লোক এতটাই সীমালঙ্ঘন করেছে যে তারা বলে থাকে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তখনই জানতে পারেন যখন তা সংঘটিত হয়ে যায়। এরাও বান্দার ক্ষমতা ও স্বাধীন ইচ্ছা সাব্যস্ত করতে গিয়ে চরম সীমা অতিক্রম করেছে এবং ভয়াবহ প্রান্তিকতায় পৌঁছে গিয়েছে।
সঠিক আকীদা — আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর ভারসাম্যপূর্ণ মত
তৃতীয় দল তারাই যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহ তাদেরকে মতপার্থক্যের সেই বিষয়ের সঠিক সত্যে পথ দেখিয়েছেন আর তারাই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ। তারা এই বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যম পথ অবলম্বন করেছেন যা শরয়ী দলিল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত। তারা বলেন যে আল্লাহ তাআলা এই বিশ্বজগতে যেসব কর্ম সংঘটিত করেন তা দুই প্রকারে বিভক্ত।
প্রথম প্রকার আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা তাঁর সৃষ্টিরাজির মধ্যে নিজস্ব কর্ম হিসেবে যা কিছু প্রবাহিত করেন তাতে কারো কোনো স্বাধীন ইচ্ছা থাকে না। যেমন বৃষ্টি বর্ষণ শস্য উৎপন্ন করা জীবন দান মৃত্যু ঘটানো রোগব্যাধি আরোগ্য দান এবং আল্লাহর সৃষ্টিজগতে পরিদৃষ্ট আরো অসংখ্য বিষয়াদি। নিঃসন্দেহে এসব ক্ষেত্রে কারো কোনো স্বাধীন ইচ্ছা নেই এবং এসবের ফায়সালায় কারো কোনো মতামত চলে না বরং একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী আল্লাহর জন্যই সকল ইচ্ছা সংরক্ষিত।
দ্বিতীয় প্রকার সেসব কর্ম যা সকল ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সৃষ্টিকুল সম্পাদন করে থাকে। এই কর্মসমূহ সেগুলো সম্পাদনকারীর স্বাধীন ইচ্ছা ও মনোনয়ন অনুযায়ী সংঘটিত হয়। কেননা আল্লাহ তাআলা সেই ইচ্ছাশক্তি তাদের হাতেই অর্পণ করেছেন।
فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
আল্লাহ তাআলা বলেন অতএব যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে কুফরি করুক।[2]সূরা আল-কাহফ, আয়াত ২৯
مِنكُم مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الْآخِرَةَ
তিনি আরো বলেন তোমাদের কেউ দুনিয়া কামনা করে আর কেউ আখিরাত কামনা করে।[3]সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫২
لِمَن شَاءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ
তিনি আরো বলেন তোমাদের মধ্যে যে চায় সে যেন সোজা পথে চলে।[4]সূরা আত-তাকবীর, আয়াত ২৮
বান্দার ইচ্ছাশক্তি ও স্বাধীনতা আছে কি — স্বেচ্ছাকৃত ও বাধ্যতামূলক কর্মের পার্থক্য
মানুষ নিজের স্বেচ্ছাকৃত কর্ম এবং অনিচ্ছায় বাধ্য হয়ে সংঘটিত কর্মের মধ্যকার পার্থক্য অনুধাবন করতে পারে। যেমন মানুষ সিঁড়ি বেয়ে ছাদ থেকে নিচে নামে এটি তার স্বেচ্ছাকৃত অবতরণ এবং সে জানে যে সে এ কাজে স্বাধীন। কিন্তু সে যদি ছাদ থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় তাহলে সে বুঝতে পারে যে সে এতে স্বাধীন ছিল না। সে এই দুই কর্মের পার্থক্য বুঝতে পারে এবং জানে যে দ্বিতীয়টি অনিচ্ছাকৃত বাধ্যতামূলক আর প্রথমটি স্বেচ্ছাকৃত। প্রতিটি মানুষই এ কথা উপলব্ধি করে।
একইভাবে মানুষ এও জানে যে সে যদি অনিচ্ছাকৃত প্রস্রাব নির্গমনের রোগে আক্রান্ত হয় তাহলে তার প্রস্রাব তার ইচ্ছার বাইরে বেরিয়ে যায়। আর যখন সে এই রোগ থেকে সুস্থ থাকে তখন তার প্রস্রাব তার ইচ্ছাধীন হয়েই বের হয়। সে এই দুই অবস্থার পার্থক্য বুঝতে পারে এবং কেউই এই পার্থক্য অস্বীকার করে না। অনুরূপভাবে বান্দার পক্ষ থেকে যা কিছু সংঘটিত হয় তার মধ্যে স্বেচ্ছায় সংঘটিত বিষয় এবং অনিচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে সংঘটিত বিষয়ের পার্থক্য সে উপলব্ধি করতে পারে। বরং আল্লাহর রহমতেরই বহিঃপ্রকাশ যে কিছু কর্ম বান্দার ইচ্ছাধীন হলেও তা তার ওপর আরোপিত হয় না যেমন ঘুমন্ত ও ভুলে যাওয়া ব্যক্তির কর্মের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ
আল্লাহ তাআলা আসহাবে কাহাফ বা গুহাবাসীদের সম্পর্কে বলেন এবং আমরা তাদেরকে ডানে ও বাঁয়ে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম।[5]সূরা আল-কাহফ, আয়াত ১৮
প্রকৃতপক্ষে তারাই পার্শ্ব পরিবর্তন করছিল কিন্তু আল্লাহ তাআলা কাজটি নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন এই কারণে যে ঘুমন্ত ব্যক্তির কোনো ইচ্ছা থাকে না এবং তার কাজের জন্য সে পাকড়াও হবে না। তাই তার কাজ আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করা হয়েছে।
مَنْ نَسِيَ وَهُوَ صَائِمٌ فَأَكَلَ أَوْ شَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ، فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় ভুলে গিয়ে খেয়ে ফেলে বা পান করে ফেলে সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে। কেননা তাকে আল্লাহই খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন।[6]হাদীসটি মুসলিমের কিতাবুস সিয়াম অধ্যায়ে ভুলে যাওয়া ব্যক্তির আহার … Continue reading
সুতরাং এই খাওয়ানো ও পান করানোর কাজটি আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কেননা বান্দার কাছ থেকে কাজটি অস্মরণ অবস্থায় সংঘটিত হয়েছে তাই সেটি যেন তার ইচ্ছাধীন ছিল না বললেই চলে। আমরা সকলেই জানি এবং পার্থক্য অনুধাবন করি যে মানুষ মাঝেমধ্যে নিজের অজান্তে ও অনিচ্ছায় যে ব্যথা অনুভব করে অথবা কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে মনে যে ভয়ের সঞ্চার হয় এবং যার কারণ সে নিজেও জানে না তার সাথে এমন ব্যথা বা আনন্দের তফাৎ রয়েছে যা তার অর্জিত কোনো কাজের ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয়। আলহামদুলিল্লাহ বিষয়টি সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও নির্মল এতে কোনো প্রকার ধোঁয়াশা বা অস্পষ্টতা নেই।
“সবই তাকদির” বলে কি পাপকে জায়েজ করা যায়?
হে ভ্রাতৃবৃন্দ আমরা যদি প্রথম দলের মত গ্রহণ করি যারা তাকদির প্রমাণে বাড়াবাড়ি করেছে তাহলে গোড়া থেকেই শরীয়ত সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে যাবে। কেননা এই মত যে বান্দার কাজে তার নিজের কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতা নেই এর অপরিহার্য ফলাফল এই দাঁড়ায় যে কোনো প্রশংসনীয় কাজের জন্য তার প্রশংসা করা হবে না এবং কোনো নিন্দনীয় কাজের জন্য তাকে তিরস্কারও করা হবে না। কারণ বাস্তবে কাজটি তার ইচ্ছা ও এখতিয়ার ব্যতিরেকেই সংঘটিত হয়েছে। এই মতের ওপর ভিত্তি করলে ফলাফল এটাই দাঁড়ায় যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা অবাধ্যজনকে অবাধ্যতার কারণে শাস্তি ও আযাব দিলে তিনি জালেম হবেন যা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে ও পবিত্র। কারণ তিনি তাকে এমন একটি কাজের জন্য শাস্তি দিলেন যাতে তার কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতা ছিল না। আর এটি নিঃসন্দেহে কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
أَلْقِيَا فِي جَهَنَّمَ كُلَّ كَفَّارٍ عَنِيدٍ مَّنَّاعٍ لِّلْخَيْرِ مُعْتَدٍ مُّرِيبٍ الَّذِي جَعَلَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ فَأَلْقِيَاهُ فِي الْعَذَابِ الشَّدِيدِ قَالَ قَرِينُهُ رَبَّنَا مَا أَطْغَيْتُهُ وَلَٰكِن كَانَ فِي ضَلَالٍ بَعِيدٍ قَالَ لَا تَخْتَصِمُوا لَدَيَّ وَقَدْ قَدَّمْتُ إِلَيْكُم بِالْوَعِيدِ مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَيَّ وَمَا أَنَا بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বলেন আর তার সঙ্গী ফেরেশতা বলবে এই তো আমার কাছে উপস্থিত আমলনামা প্রস্তুত রয়েছে। আদেশ হলো তোমরা উভয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো প্রত্যেক অকৃতজ্ঞ কঠোর হৃদয় কাফিরকে যে কল্যাণের কাজে বাধা দিত সীমালঙ্ঘনকারী ও সন্দেহ পোষণকারী ছিল। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ স্থির করেছিল সুতরাং তোমরা উভয়ে তাকে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ করো। তার সঙ্গী শয়তান বলবে হে আমাদের পালনকর্তা আমি তাকে বিদ্রোহী করিনি বরং সে নিজেই ছিল সুদূর পথভ্রষ্টতায় নিমগ্ন। আল্লাহ বলবেন আমার সামনে তোমরা ঝগড়া করো না। আমি তো পূর্বেই তোমাদেরকে শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছিলাম। আমার কাছে কথা রদবদল হয় না এবং আমি বান্দাদের প্রতি মোটেও জুলুমকারী নই।[7]সূরা কাফ, আয়াত ২৩-২৯
অতএব আল্লাহ সুবহানাহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এই শাস্তি প্রদান তাঁর পক্ষ থেকে কোনো জুলুম নয় বরং তা পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার। কারণ তিনি তাদেরকে পূর্বেই শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করেছিলেন এবং তাদের সামনে পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন সত্যকেও স্পষ্ট করেছিলেন মিথ্যাকেও স্পষ্ট করেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেদের জন্য বাতিলের পথ অবলম্বন করাই পছন্দ করেছিল। ফলে আল্লাহর কাছে তাদের কোনো দলিল বা অজুহাত আর অবশিষ্ট থাকে না।
رُّسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ
আল্লাহ বলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি যাতে রাসূলগণের আগমনের পর মানুষের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত অবশিষ্ট না থাকে।[8]সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৬৫
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা রাসূল প্রেরণের পর মানুষের কোনো অজুহাত থাকার সম্ভাবনা সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দিয়েছেন কারণ রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ কায়েম হয়ে গিয়েছে। যদি তাকদির মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য কোনো অজুহাত হতো তাহলে রাসূল প্রেরণের পরও সেই অজুহাত অবশিষ্ট থাকত। কেননা আল্লাহর তাকদির তো রাসূল প্রেরণের পূর্বেও বিরাজমান ছিল এবং পরেও রয়েছে। সুতরাং এই বাতিল মতবাদকে বাস্তবতাই মিথ্যা সাব্যস্ত করছে যেমনটি আমরা পূর্ববর্তী উদাহরণগুলোতে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।
পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দলের মতবাদও শরীয়তের সুস্পষ্ট বক্তব্য এবং বাস্তবতার নিরিখে খণ্ডিত হয়ে যায়। কেননা শরীয়তের বক্তব্যসমূহ অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অনুগামী ও তার অধীন।
لِمَن شَاءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
আল্লাহ বলেন তোমাদের মধ্যে যে চায় সে যেন সোজা পথ অবলম্বন করে। আর তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না যতক্ষণ না বিশ্বজাহানের পালনকর্তা আল্লাহ ইচ্ছা করেন।[9]সূরা আত-তাকবীর, আয়াত ২৮-২৯
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَخْتَارُ
তিনি আরো বলেন এবং তোমার পালনকর্তা যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যা ইচ্ছা মনোনীত করেন।[10]সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৬৮
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَىٰ دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
তিনি আরো বলেন আর আল্লাহ শান্তির আবাস জান্নাতের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন।[11]সূরা ইউনুস, আয়াত ২৫
যারা এই মতবাদ পোষণ করে তারা প্রকৃতপক্ষে রবুবিয়াত বা আল্লাহর প্রভুত্বের একটি দিককে বাতিল করে দিচ্ছে। তারা এও দাবি করছে যে আল্লাহর রাজত্বে এমন কিছু বিদ্যমান রয়েছে যা তিনি ইচ্ছা করেন না এবং সৃষ্টিও করেন না। অথচ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা প্রতিটি বস্তুর জন্যই ইচ্ছা পোষণকারী প্রতিটি বস্তুর স্রষ্টা এবং প্রতিটি বস্তুর ভাগ্য নির্ধারণকারী। তারা আরো সেই অনস্বীকার্য সত্যেরও বিরোধিতা করছে যা প্রত্যেকে স্বভাবতই জানে যে সমগ্র সৃষ্টিজগতের সত্তাগত অস্তিত্ব ও গুণাবলি সবকিছুই আল্লাহর একচ্ছত্র মালিকানাধীন। সত্তা ও গুণের মাঝে অথবা অর্থ ও দেহের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং সবকিছুই আল্লাহর এবং এটি কখনোই সম্ভব নয় যে তাঁর রাজত্বে এমন কিছু থাকবে যা তিনি তাবারাকা ওয়া তাআলা ইচ্ছা করেন না। কিন্তু আমাদের জন্য একটি প্রশ্ন থেকেই যায় যদি বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং সকল কর্তৃত্ব তাঁরই হাতে থাকে তাহলে মানুষের করণীয় কী এবং মানুষের উপায়ই বা কী হবে যদি আল্লাহ তাআলা তার ভাগ্যেই পথভ্রষ্টতা লিখে দিয়ে থাকেন আর সে হেদায়েত না পায়।
আল্লাহর প্রজ্ঞা ও তাকদিরের সম্পর্ক — কাউকে কেন পথভ্রষ্ট করা হয়?
তাহলে আমরা এর উত্তর বলব এভাবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা কেবল তাকেই হেদায়েত দান করেন যে হেদায়েতের যোগ্য আর যার মধ্যে পথভ্রষ্টতার উপাদান বিদ্যমান তাকেই তিনি পথভ্রষ্ট করেন।
فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বলেন অতঃপর যখন তারা বাঁকা পথ অবলম্বন করল তখন আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহকে আরও বাঁকা করে দিলেন।[12]সূরা আস-সফ, আয়াত ৫
فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ
তিনি আরো বলেন অতঃপর তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমরা তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরগুলোকে কঠোর করে দিয়েছি। তারা কালামসমূহকে তার মূল স্থান থেকে সরিয়ে বিকৃত করে ফেলে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তার একটি বড় অংশ তারা ভুলে গিয়েছিল।[13]সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ১৩
এভাবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ খোদ বান্দার নিজের মধ্যেই নিহিত। আর বান্দা তো যেমনটি আমরা একটু আগে উল্লেখ করেছি আল্লাহ তার ভাগ্যে কী নির্ধারণ করে রেখেছেন তা জানে না। কেননা তাকদির নির্ধারিত ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্বে সে তা জানতে পারে না।
অতএব বান্দা জানে না আল্লাহ তার ভাগ্যে পথভ্রষ্টতা লিখেছেন নাকি হেদায়েত লিখেছেন। তাহলে সে কেন পথভ্রষ্টতার পথে চলবে আর তারপর আল্লাহ তাআলা যে তার জন্য এটাই ইচ্ছা করেছিলেন সে অজুহাত দেখাবে। তার জন্য কি উচিত নয় যে সে হেদায়েতের পথে চলবে এবং তারপর বলবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমাকে সরল পথের দিশা দিয়েছেন। সে কি পথভ্রষ্টতার সময় জবরিয়া মতবাদের অনুসারী হবে এবং আনুগত্যের সময় কদরিয়া মতবাদের অনুসারী হবে। কখনোই না। মানুষের জন্য শোভনীয় নয় যে সে পথভ্রষ্টতা ও অবাধ্যতার বেলায় জবরিয়া হবে আর যখনই পথভ্রষ্ট হবে বা আল্লাহর নাফরমানি করবে তখন বলবে এটি তো আমার ভাগ্যে লেখা ছিল এবং নির্ধারিত ছিল। আল্লাহ যা ফায়সালা করেছেন তা থেকে বের হওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আর আনুগত্য ও হেদায়েতের বেলায় বলবে হ্যাঁ এটা তো আমার নিজের কাছ থেকেই সম্পাদিত হয়েছে এবং সে তা নিজের কৃতিত্ব মনে করে আল্লাহর ওপর অনুগ্রহ জ্ঞাপন করবে। ফলে সে আনুগত্যের দিক দিয়ে হবে কদরিয়া আর অবাধ্যতার দিক দিয়ে হবে জবরিয়া। এটি কখনোই সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষের রয়েছে ক্ষমতা এবং তার রয়েছে স্বাধীন ইচ্ছা। আর হেদায়েতের দরজাটি রিযিকের দরজা কিংবা জ্ঞান অর্জনের দরজা থেকে মোটেও বেশি অস্পষ্ট বা দুর্গম নয়।
রিযিক ও চিকিৎসার উদাহরণে তাকদির ও আমলের সম্পর্ক
মানুষ যেমনটি সকলের জানা তার জন্য রিযিকের যে পরিমাণ নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে তা পূর্ব থেকেই লিখিত রয়েছে। তা সত্ত্বেও সে রিযিকের উপায় উদ্ভাবনের লক্ষ্যে নিজের দেশে ও দেশের বাইরে ডানে বাঁয়ে সর্বত্র ছুটোছুটি করে বেড়ায়। সে কখনো নিজের ঘরে বসে থাকে না আর বলে যে আমার জন্য যদি রিযিক নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে তা আমার কাছে এমনিতেই পৌঁছে যাবে। বরং সে রিযিকের উপকরণ অন্বেষণে সচেষ্ট থাকে অথচ রিযিক নিজেও কর্মের সাথে সম্পৃক্ত যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে।
إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا نُطْفَةً، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يُرْسَلُ إِلَيْهِ الْمَلَكُ، فَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ: بِكَتْبِ رِزْقِهِ وَأَجَلِهِ وَعَمَلِهِ وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি উপাদান তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন যাবৎ বীর্যরূপে একত্রিত রাখা হয়। তারপর তা জমাট রক্তপিণ্ডে পরিণত হয় আরো চল্লিশ দিন। তারপর তা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয় আরো চল্লিশ দিন। তারপর তার কাছে ফেরেশতা প্রেরিত হয় এবং তাকে চারটি বাক্য লিখার আদেশ দেওয়া হয় সে লিখে তার রিযিক তার মৃত্যুক্ষণ তার আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে না দুর্ভাগা হবে।[14]হাদীসটি বুখারীর কিতাব বাদউল খালক অধ্যায়ে ফেরেশতাদের আলোচনায় ৩২০৮ … Continue reading
এই রিযিকও যেমনিভাবে লিখিত রয়েছে তেমনিভাবে ভালো বা মন্দ আমলও লিখিত রয়েছে। তাহলে তোমার কী অবস্থা যে তুমি দুনিয়ার রিযিকের খোঁজে ডানে বাঁয়ে দৌড়াদৌড়ি করছো এবং দেশদেশান্তর ও মরুপ্রান্তরে ভ্রমণ করছো কিন্তু আখিরাতের সম্বল অর্জন এবং চিরস্থায়ী নিয়ামতের আবাস জান্নাত লাভের জন্য কোনো সৎকর্ম সম্পাদন করছো না। এই দুইটি দরজা আসলে একই এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তুমি যেমন নিজের রিযিকের জন্য চেষ্টা করো নিজের জীবন ও নির্ধারিত বয়স অতিবাহিত করার জন্য কাজ করো আর যখন কোনো রোগে আক্রান্ত হও তখন দুনিয়ার ডাক্তারদের কাছে ছুটে যাও এবং এমন একজন দক্ষ চিকিৎসক চাও যে তোমার ব্যাধির চিকিৎসা করবে অথচ তোমার জন্য মৃত্যুর যে সময় নির্ধারিত রয়েছে তা কখনো বাড়বে না কমবেও না। তুমি কখনো এই তাকদিরের ওপর ভরসা করে বসে থাকো না এবং বলো না যে আমি ঘরে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকবই যদি আল্লাহ আমার আয়ু বাড়াতে চান তাহলে তা এমনিতেই বেড়ে যাবে।
বরং আমরা দেখতে পাই তুমি তোমার সর্বশক্তি ও অনুসন্ধিৎসা নিয়ে এমন চিকিৎসকের খোঁজে ছুটে বেড়াও যার হাতে তোমার ধারণা আল্লাহ আরোগ্য দানের ফায়সালা করতে পারেন। তাহলে আখিরাতের পথে এবং সৎকর্ম সম্পাদনে তোমার কর্মপ্রচেষ্টা কেন দুনিয়ার কাজে তোমার প্রয়াসের মতো হবে না।
আমরা পূর্বেই বলেছি যে আল্লাহর ফায়সালা বা তাকদির একটি গোপন রহস্য যা সম্পর্কে তুমি কিছুই জানতে পারো না। এখন তুমি দুটি পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ একটি পথ তোমাকে নিরাপত্তা সাফল্য সুখ ও সম্মানের দিকে নিয়ে যায় আর অপর পথটি তোমাকে ধ্বংস অনুতাপ ও লাঞ্ছনার দিকে নিয়ে যায়। তুমি এখন এই দুই পথের মাঝে দণ্ডায়মান এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ইচ্ছাধীন। তোমার সামনে এমন কেউ নেই যে তোমাকে ডান দিকের পথে চলতে বাধা দিচ্ছে বা বাম দিকের পথে চলতেও বাধা দিচ্ছে। তুমি চাইলে একদিকে যেতে পারো আবার চাইলে অন্যদিকে যেতে পারো। তাহলে তুমি কেন বাম দিকের পথ অবলম্বন করো আর তারপর বলো যে আমার ভাগ্যেই এটি নির্ধারিত ছিল। তোমার জন্য কি উচিত নয় যে তুমি ডান দিকের পথটি গ্রহণ করো এবং বলো যে এটি আমার জন্য নির্ধারিত হয়েছিল। যদি তুমি কোনো দেশে সফর করার ইচ্ছা করো এবং তোমার সামনে দুটি পথ থাকে একটি পাকা সংক্ষিপ্ত ও নিরাপদ আর অপরটি কাঁচা দীর্ঘ ও ভীতিপ্রদ তাহলে আমরা দেখতে পাই যে তুমি অবশ্যই পাকা সংক্ষিপ্ত ও নিরাপদ পথটিকেই বেছে নেবে। তুমি কখনোই কাঁচা দীর্ঘ ও ভীতিপ্রদ পথে যাবে না। এটি হলো বাহ্যিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পথের উদাহরণ। সুতরাং আধ্যাত্মিক ও চিন্তাগত পথও এর সম্পূর্ণ সমতুল্য এবং এর থেকে কখনোই ভিন্ন নয়। কিন্তু মাঝে মাঝে প্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তিই বিবেকের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে এবং বিবেকের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলে। অথচ মুমিন ব্যক্তির উচিত তার বিবেক যেন তার প্রবৃত্তির ওপর প্রবল থাকে। আর যখন সে তার বিবেককে কাজে লাগায় তখন প্রকৃত অর্থেই বিবেক তার অধিকারীকে ক্ষতিকর বিষয় থেকে বিরত রাখে এবং যা তার জন্য কল্যাণকর ও আনন্দদায়ক তাতে তাকে প্রবিষ্ট করে দেয়।
এতদ্বারা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছাধীন কর্মসমূহ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই সম্পাদন করে থাকে। আর সে যেমন তার পার্থিব কাজকর্ম নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী সম্পন্ন করে এবং সে চাইলে এই পণ্যটিকে কিংবা ওই পণ্যটিকে নিজের ব্যবসার উপকরণ বানাতে পারে ঠিক তেমনিভাবে আখিরাতের পথেও সে নিজের স্বাধীন ইচ্ছা অনুসারেই চলমান থাকে। বরং আখিরাতের পথগুলো দুনিয়ার পথগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার। কারণ আখিরাতের পথসমূহের ব্যাখ্যাকারী স্বয়ং আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষায়। সুতরাং আখিরাতের পথগুলো যে দুনিয়ার পথের তুলনায় অধিকতর ব্যাখ্যাত ও সর্বাধিক উজ্জ্বলরূপে সুস্পষ্ট হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও মানুষ দুনিয়ার পথে এমনভাবে চলতে থাকে যার ফলাফলের নিশ্চয়তা তার কাছে নেই কিন্তু সে আখিরাতের পথগুলো ছেড়ে দেয় অথচ তার ফলাফল সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত ও জ্ঞাত। কারণ তা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি দ্বারা স্থিরীকৃত আর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা কখনোই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।
তাকদিরের উপর সঠিক ঈমান — আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মত
এতদসত্ত্বেও আমরা বলি যে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এই মতবাদকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং নিজেদের আকীদা ও মাজহাব হিসেবে গ্রহণ করেছেন যে মানুষ নিজের ইচ্ছায় কর্ম সম্পাদন করে এবং সে যা চায় তাই বলে কিন্তু তার ইচ্ছা ও স্বাধীনতা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের অনুগামী। তদুপরি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা তাঁর হিকমত বা প্রজ্ঞার অনুগামী। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ইচ্ছা কখনোই শর্তহীন ও উদ্দেশ্যহীনভাবে প্রযুক্ত হয় না বরং তা তাঁর প্রজ্ঞার অধীনস্থ। কেননা আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহের অন্যতম নাম হলো আল হাকীম বা প্রজ্ঞাময়। আর আল হাকীম অর্থাৎ তিনি হলেন সর্বোচ্চ শাসক ও দৃঢ়কারী যিনি সৃষ্টিগত ও শরীয়তগতভাবে সকল বিষয়ের ফায়সালা করেন এবং কার্যগত ও নির্মাণগত দিক থেকে তাকে মজবুত ও সুবিন্যস্ত করেন। আল্লাহ তাআলা স্বীয় প্রজ্ঞায় তার জন্যই হেদায়েতের ভাগ্য নির্ধারণ করেন যে হেদায়েত চায় যার সম্পর্কে তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা জানেন যে সে সত্যের অনুসারী এবং তার অন্তর সরলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর তিনি তার জন্য পথভ্রষ্টতা নির্ধারণ করেন যে এমন নয় যার কাছে ইসলাম পেশ করা হলে তার বক্ষ সংকুচিত হয়ে যায় যেন সে আকাশে আরোহণ করছে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার প্রজ্ঞা কখনোই এটা মেনে নেয় না যে এমন ব্যক্তি হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে তবে হ্যাঁ যদি আল্লাহ তার জন্য নতুন কোনো অনুগ্রহ সৃষ্টি করেন এবং তার ইচ্ছাকে অন্য কোনো ইচ্ছায় পরিবর্তিত করে দেন। আর আল্লাহ তাআলা সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। কিন্তু আল্লাহর প্রজ্ঞা এই বিষয়টিকে অপরিহার্য করে যে কারণসমূহকে তাদের ফলাফলের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত রাখা হবে।
তাকদির সংক্রান্ত সঠিক আকীদার চারটি স্তর
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর নিকট তাকদির ও আল্লাহর ফায়সালার চারটি স্তর রয়েছে।
প্রথম স্তর — ইলম: আল্লাহর সর্বজ্ঞতার উপর দৃঢ় বিশ্বাস
প্রথম স্তর হল ইলম বা জ্ঞান। তা এই যে মানুষ দৃঢ় ও অকাট্যভাবে বিশ্বাস করবে যে আল্লাহ তাআলা সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। তিনি আসমান ও জমিনের সকল কিছু সামগ্রিক ও বিস্তারিতভাবে জানেন চাই তা তাঁর নিজস্ব কর্ম হোক অথবা তাঁর সৃষ্টিজীবের কর্ম হোক। জমিনে বা আসমানে আল্লাহর নিকট কোনো কিছুই গোপন থাকে না।
দ্বিতীয় স্তর — কিতাবাত: লাওহে মাহফুজে সবকিছু লিপিবদ্ধ
দ্বিতীয় স্তর হল কিতাবাত বা লিখন। তা এই যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা তাঁর নিকট লাওহে মাহফুজে প্রতিটি বস্তুর নির্ধারিত ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
আল্লাহ তাআলা এই দুই স্তরকে একত্রে উল্লেখ করে বলেছেন তুমি কি জানো না যে আল্লাহ আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই জানেন। নিশ্চয়ই তা একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিশ্চয়ই এটি আল্লাহর জন্য অতি সহজ।[15]সূরা আল-হজ্জ, আয়াত ৭০
তিনি সুবহানাহু এখানে প্রথমে জ্ঞানের কথা বলেছেন এবং তারপর বলেছেন যে তা একটি কিতাবে রয়েছে অর্থাৎ লাওহে মাহফুজে তা লিপিবদ্ধ রয়েছে।
إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ، فَقَالَ لَهُ: اكْتُبْ، قَالَ: رَبِّ وَمَاذَا أَكْتُبُ؟ قَالَ: اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ
যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে বলেন লেখো। কলম বলল হে আমার রব কী লিখব। তিনি বললেন যা কিছু সংঘটিত হবে তা লিখে ফেলো। অতঃপর সেই মুহূর্তেই কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লিপিবদ্ধ হয়ে গেল।[16]হাদীসটি আবু দাউদের কিতাবুস সুন্নাহ অধ্যায়ে তাকদির অনুচ্ছেদে ৪৭০০ নম্বরে … Continue reading
এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আমরা যে আমল করি তা কি ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে নাকি তা এমন কিছু যা ইতিমধ্যেই নির্ধারিত ও সম্পন্ন হয়ে গেছে।
قَالَ: بَلْ أَمْرٌ قَدْ فُرِغَ مِنْهُ
তিনি বললেন নিশ্চয়ই তা নির্ধারিত ও সম্পন্ন হয়ে গেছে।[17]হাদীসটি আহমদ ও তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে তিরমিযীর কিতাবু তাফসীরিল কুরআন … Continue reading
আরো জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন তাহলে কি আমরা আমল ছেড়ে দিয়ে প্রথম কিতাবের ওপর ভরসা করে বসে থাকবো।
اعْمَلُوا، فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ
তিনি বললেন তোমরা আমল করো কারণ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে কাজের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তা সহজ করে দেওয়া হয়েছে।[18]হাদীসটি বুখারীর কিতাবুল জানায়েয অধ্যায়ে কবরের পাশে উপস্থিত ব্যক্তিকে … Continue reading
এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাগণকে আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং হে আমার ভাই তুমিও আমল করতে থাকো আর তুমি যে উদ্দেশ্যে সৃষ্ট হয়েছ সে পথই তোমার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার এই বাণী তিলাওয়াত করলেন
فَأَمَّا مَن أَعْطَىٰ وَاتَّقَىٰ وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَىٰ فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَىٰ وَأَمَّا مَن بَخِلَ وَاسْتَغْنَىٰ وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَىٰ فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَىٰ
অতএব যে ব্যক্তি দান করলো তাকওয়া অবলম্বন করলো এবং উত্তম বিষয়কে সত্য বলে বিশ্বাস করলো আমি তাকে সহজ পথের জন্য সহজ করে দেবো। আর যে ব্যক্তি কৃপণতা করলো নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো আমি তাকে কঠিন পথের জন্য সহজ করে দেবো।[19]সূরা আল-লাইল, আয়াত ৫-১০
তৃতীয় স্তর — মাশীআত: আল্লাহর ইচ্ছা সকল কিছু পরিব্যাপ্ত
তৃতীয় স্তর হল মাশীআত বা ইচ্ছা। তা এই যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা আসমান ও জমিনে বিদ্যমান বা অনুপস্থিত সকল কিছুর জন্যই ইচ্ছা পোষণ করেছেন। সুতরাং যা কিছু বিদ্যমান রয়েছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাতেই বিদ্যমান হয়েছে এবং যা কিছু অনুপস্থিত রয়েছে তাও একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাতেই অনুপস্থিত রয়েছে। পবিত্র কুরআনে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। আল্লাহ তাআলা নিজ কর্মের ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছা এবং বান্দার কর্মের ক্ষেত্রেও তাঁর ইচ্ছাকে সাব্যস্ত করেছেন।
لِمَن شَاءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
আল্লাহ তাআলা বলেন তোমাদের মধ্যে যে চায় সে সোজা পথ অবলম্বন করুক। আর তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না যতক্ষণ না বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা করেন।[20]সূরা আত-তাকবীর, আয়াত ২৮-২৯
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ
তিনি আরো বলেন আর তোমার রব যদি ইচ্ছা করতেন তাহলে তারা এ কাজ করতো না।[21]সূরা আল-আনআম, আয়াত ১১২
وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَٰكِنَّ اللَّهُ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ
তিনি আরো বলেন আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তাহলে তারা পরস্পর যুদ্ধ করতো না কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করে থাকেন।[22]সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৩
অতএব আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে মানুষের কর্মসমূহ তাঁরই ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। আর তাঁর নিজের কর্মের কথা তো অনেক আয়াতেই বর্ণিত হয়েছে।
وَلَوْ شِئْنَا لَآتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَاهَا
তিনি বলেন আর আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার হেদায়েত দান করতাম।[23]সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত ১৩
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً
তিনি আরো বলেন আর তোমার রব যদি ইচ্ছা করতেন তাহলে সমস্ত মানুষকে একই উম্মতে পরিণত করতেন।[24]সূরা হুদ, আয়াত ১১৮
এমন আরো অসংখ্য আয়াত রয়েছে যেগুলোতে তাঁর নিজ কর্মের ক্ষেত্রে ইচ্ছার বিষয়টি সাব্যস্ত করা হয়েছে। অতএব ততক্ষণ পর্যন্ত তাকদিরের ওপর ঈমান পূর্ণতা পাবে না যতক্ষণ না আমরা বিশ্বাস করি যে আল্লাহর ইচ্ছা প্রতিটি বিদ্যমান ও অনুপস্থিত বস্তুর জন্য ব্যাপক ও পরিব্যাপ্ত। যা কিছু অনুপস্থিত তা আল্লাহ তাআলার অনস্তিত্বের ইচ্ছাতেই অনুপস্থিত এবং যা কিছু বিদ্যমান তা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব দানের ইচ্ছাতেই বিদ্যমান। আসমান ও জমিনে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছুই কখনো সংঘটিত হতে পারে না।
চতুর্থ স্তর — খালক: আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা
চতুর্থ স্তর হল সৃষ্টি বা সৃজন। অর্থাৎ আমরা যেন বিশ্বাস করি যে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বস্তুরই স্রষ্টা। আসমান ও জমিনে যা কিছু বিদ্যমান রয়েছে তার স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। এমনকি মৃত্যুকেও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা সৃষ্টি করে থাকেন যদিও মৃত্যু হল জীবনের অবসান বা অনুপস্থিতি।
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
আল্লাহ তাআলা বলেন তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য যে তোমাদের মধ্যে কর্মে কে সর্বোত্তম।[25]সূরা আল-মুলক, আয়াত ২
অতএব আসমান ও জমিনের প্রতিটি বস্তুর স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা ব্যতীত আর কোনো স্রষ্টা নেই। আমরা সকলেই জানি যে তাঁর সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিজস্ব কর্মসমূহ তাঁরই সৃষ্টি। যেমন আসমানসমূহ জমিন পর্বতমালা নদনদী সূর্য চন্দ্র নক্ষত্র বায়ু মানুষ চতুষ্পদ জন্তু এগুলো সবই আল্লাহর সৃষ্টি। তেমনিভাবে এসব সৃষ্টির গুণাবলি ও অবস্থার পরিবর্তনগুলোও সবই আল্লাহর সৃষ্টি।
কিন্তু মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে আমাদের ইচ্ছাধীন কাজ ও কথাকে কীভাবে আল্লাহর সৃষ্টি বলা যেতে পারে এবং তা কীভাবে সঠিক হবে। আমরা বলব হ্যাঁ তা বলাই সঠিক ও যথার্থ। কারণ আমাদের কাজ ও কথা দুটি বিষয় থেকে উৎপন্ন হয়।
একটি হলো ক্ষমতা বা সামর্থ্য।
দ্বিতীয়টি হলো ইচ্ছা বা সংকল্প।
সুতরাং যখন বান্দার কাজ তার ইচ্ছা ও ক্ষমতা থেকে উৎপন্ন হয় তখন যে সত্তা এই ইচ্ছা সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের অন্তরকে ইচ্ছা গ্রহণের উপযোগী করে বানিয়েছেন তিনি হলেন আল্লাহ। অনুরূপভাবে যিনি তার মধ্যে কর্মক্ষমতা সৃষ্টি করেছেন তিনিও আল্লাহ। আর যিনি পূর্ণাঙ্গ কারণ সৃষ্টি করেন যা থেকে ফলাফল উৎপন্ন হয় আমরা বলি যে পূর্ণাঙ্গ কারণের স্রষ্টাই হলেন ফলাফলের স্রষ্টা। অর্থাৎ যিনি প্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদানের স্রষ্টা তিনিই সেই প্রভাবেরও স্রষ্টা। সুতরাং আল্লাহ তাআলা বান্দার কর্মের স্রষ্টা হওয়ার দিকটি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে আমরা বলব বান্দার কাজ ও কথা দুটি বিষয় থেকে উৎপন্ন হয়।
এক ইচ্ছা বা সংকল্প।
দুই ক্ষমতা বা সামর্থ্য।
যদি ইচ্ছা না থাকতো তাহলে সে কাজ করতো না আর যদি ক্ষমতা না থাকতো তাহলেও সে কাজ করতো না। কেননা সে যদি ইচ্ছা করে কিন্তু অক্ষম হয় তাহলে কাজ সম্পন্ন হবে না। আর যদি সে সক্ষম হয় কিন্তু ইচ্ছা না করে তাহলেও কাজ সম্পন্ন হবে না। সুতরাং যখন কাজটি দৃঢ় ইচ্ছা ও পূর্ণ ক্ষমতা থেকে উৎপন্ন হয় তখন যিনি সেই দৃঢ় ইচ্ছা ও পূর্ণ ক্ষমতার স্রষ্টা তিনি হলেন আল্লাহ। আর এই পথ ধরেই আমরা জানতে পারলাম কীভাবে আমরা বলতে পারি যে আল্লাহ তাআলা বান্দার কর্মের স্রষ্টা। নতুবা প্রকৃত অর্থে কাজের সম্পাদনকারী তো বান্দাই। সেই পবিত্রতা অর্জনকারী সেই নামাজ আদায়কারী সেই যাকাত প্রদানকারী সেই রোজা পালনকারী সেই হজ্জ সম্পাদনকারী সেই উমরাহ পালনকারী সেই অবাধ্য আর সেই অনুগত বান্দাই। কিন্তু এই সকল কাজ সংঘটিত ও বিদ্যমান হয়েছে এমন ইচ্ছা ও ক্ষমতার মাধ্যমে যা আল্লাহর সৃষ্টি। আলহামদুলিল্লাহ বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
আর এই পূর্বোক্ত চারটি স্তর অবশ্যই আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতে হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কাজকে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সম্পাদনকারীর দিকে সম্পৃক্ত করা যাবে না।
যেমন আমরা বলি আগুন জ্বালায় অথচ নিঃসন্দেহে আগুনের মধ্যে জ্বালানোর ক্ষমতা যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি আল্লাহ তাআলা। আগুন নিজস্ব প্রকৃতিগতভাবে জ্বালায় না বরং আল্লাহ তাআলা তাকে জ্বালানোর গুণ দিয়েছেন বলেই সে জ্বালায়। এই কারণেই যে আগুনে ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তা জ্বালানো আগুন ছিল না। কেননা আল্লাহ তাআলা আগুনকে বলেছিলেন
يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ
হে আগুন তুমি ইব্রাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।[26]সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৬৯
ফলে তা ইব্রাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং আগুন নিজস্ব সত্তায় জ্বালায় না বরং আল্লাহ তাআলা তার মধ্যে জ্বালানোর ক্ষমতা সৃষ্টি করেছেন। আর এই জ্বালানোর ক্ষমতা বান্দার কর্মের বিপরীতে অবস্থিত যেমন বান্দার ইচ্ছা ও ক্ষমতা। বান্দার ইচ্ছা ও ক্ষমতার মাধ্যমেই কর্ম সংঘটিত হয় আর আগুনের মধ্যে জ্বালানো উপাদানের মাধ্যমেই দহনক্রিয়া সংঘটিত হয়। এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু যেহেতু বান্দার রয়েছে ইচ্ছা চেতনা স্বাধীনতা ও কর্মক্ষমতা তাই বাস্তবিক অর্থে ও শরয়ী দৃষ্টিতে কাজ তার দিকেই সম্পৃক্ত করা হয়। ফলে বিরুদ্ধাচরণের জন্য সে পাকড়াও হবে এবং শাস্তি পাবে কারণ সে নিজ ইচ্ছায় কাজ করে এবং নিজ ইচ্ছায় কাজ ছেড়ে দেয়।
তাকদিরের উপর সঠিক ঈমান — মুমিনের করণীয় ও মনোভাব কেমন হবে?
পরিশেষে আমরা বলব মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহ তাআলাকে রব হিসেবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। আর রবুবিয়াত বা প্রভুত্বের প্রতি পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির অংশই হলো আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদিরের ওপর ঈমান আনা এবং একথা উপলব্ধি করা যে বান্দার সম্পাদিত কর্ম তার অন্বিষ্ট রিযিক এবং সে যে মৃত্যুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে চায় এসবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। প্রতিটি বিষয়ের দরজাই একই প্রতিটি বিষয়ই লিপিবদ্ধ প্রতিটি বিষয়ই নির্ধারিত এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই যে কাজের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তা সহজ করে দেওয়া হয়েছে।
আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদেরকে সেই সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত করেন যাদের জন্য সৌভাগ্যবানদের আমল সহজ করে দেওয়া হয় এবং আমাদের ভাগ্যে দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক পথ ও সংশোধন লিখে দেন। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবাগণের ওপর।
অনুবাদঃ সাফিন চৌধুরী
References
| ↑1 | হাদীসটি তিরমিযীর কিতাবুল কদর অধ্যায়ে তাকদির নিয়ে বিতর্কে কঠোরতা প্রসঙ্গে ৩২৫৩ নম্বরে এবং ইবনে মাজাহর মুকাদ্দিমায় কদর অধ্যায়ে ৮৫ নম্বরে বর্ণিত হয়েছে। |
|---|---|
| ↑2 | সূরা আল-কাহফ, আয়াত ২৯ |
| ↑3 | সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫২ |
| ↑4 | সূরা আত-তাকবীর, আয়াত ২৮ |
| ↑5 | সূরা আল-কাহফ, আয়াত ১৮ |
| ↑6 | হাদীসটি মুসলিমের কিতাবুস সিয়াম অধ্যায়ে ভুলে যাওয়া ব্যক্তির আহার পানাহার ও সঙ্গম রোজা ভঙ্গ করে না শীর্ষক অনুচ্ছেদে ১১৫৫ নম্বরে বর্ণিত হয়েছে। |
| ↑7 | সূরা কাফ, আয়াত ২৩-২৯ |
| ↑8 | সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৬৫ |
| ↑9 | সূরা আত-তাকবীর, আয়াত ২৮-২৯ |
| ↑10 | সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৬৮ |
| ↑11 | সূরা ইউনুস, আয়াত ২৫ |
| ↑12 | সূরা আস-সফ, আয়াত ৫ |
| ↑13 | সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ১৩ |
| ↑14 | হাদীসটি বুখারীর কিতাব বাদউল খালক অধ্যায়ে ফেরেশতাদের আলোচনায় ৩২০৮ নম্বরে এবং মুসলিমের কিতাবুল কদর অধ্যায়ে মায়ের পেটে মানব সৃষ্টির বিবরণ শীর্ষক অনুচ্ছেদে ২৬৪৩ নম্বরে বর্ণিত হয়েছে। |
| ↑15 | সূরা আল-হজ্জ, আয়াত ৭০ |
| ↑16 | হাদীসটি আবু দাউদের কিতাবুস সুন্নাহ অধ্যায়ে তাকদির অনুচ্ছেদে ৪৭০০ নম্বরে এবং তিরমিযীর কিতাবুল কদর অধ্যায়ে ৩১৫৫ নম্বরে বর্ণিত হয়েছে। |
| ↑17 | হাদীসটি আহমদ ও তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে তিরমিযীর কিতাবু তাফসীরিল কুরআন অধ্যায়ে সূরা হুদ অনুচ্ছেদে ৩১১১ নম্বরে। |
| ↑18 | হাদীসটি বুখারীর কিতাবুল জানায়েয অধ্যায়ে কবরের পাশে উপস্থিত ব্যক্তিকে উপদেশদান অনুচ্ছেদে ১৩৬২ নম্বরে এবং মুসলিমের কিতাবুল কদর অধ্যায়ে মায়ের পেটে মানব সৃষ্টির বিবরণ শীর্ষক অনুচ্ছেদে ২৬৪৭ নম্বরে বর্ণিত হয়েছে। |
| ↑19 | সূরা আল-লাইল, আয়াত ৫-১০ |
| ↑20 | সূরা আত-তাকবীর, আয়াত ২৮-২৯ |
| ↑21 | সূরা আল-আনআম, আয়াত ১১২ |
| ↑22 | সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৩ |
| ↑23 | সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত ১৩ |
| ↑24 | সূরা হুদ, আয়াত ১১৮ |
| ↑25 | সূরা আল-মুলক, আয়াত ২ |
| ↑26 | সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৬৯ |
