আল্লাহর বিধান ব্যতীত ফায়সালা ও মানবরচিত সংবিধান প্রণয়ন করার হুকুম প্রসঙ্গত ইসলামী বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। সূরা আল-মায়িদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তিনটি ভিন্ন বিশেষণ দিয়েছেন — কাফির, জালিম ও ফাসিক। এই তিনটি বিশেষণের সঠিক বিশ্লেষণ না বুঝলে একদিকে বাড়াবাড়ি তাকফির, অন্যদিকে অতিরিক্ত ঢিলেমির বিপদ তৈরি হয়। শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল-উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ তাঁর একাধিক ফাতাওয়া ও তাফসিরে এই বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তারিত ও সুশৃঙ্খলভাবে আলোচনা করেছেন। আমার এই প্রবন্ধে আমি শায়েখের মতগুলো একত্রিত করেছি ও তর্জমা করে সংক্ষিপ্তসার ব্যাখা জুড়ে দিয়েছি যাতে পাঠকরা উপকৃত হতে পারে।
আল্লাহর বিধান ব্যতীত ফায়সালা করলে শাসক কাফির, ফাসিক মাকি জালিম?
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ
আল্লাহ যারা তাঁর নাজিলকৃত বিধান মোতাবেক বিচার করে না তাদের তিনটি বিশেষণে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘আর যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুযায়ী বিচার করে না, তারাই কাফির।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৪৪)
তিনি আরও বলেছেন, ‘আর যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুযায়ী বিচার করে না, তারাই জালিম।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৪৫)
এবং তিনি বলেছেন, ‘আর যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুযায়ী বিচার করে না, তারাই ফাসিক।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৪৭)
এ বিষয়ে আহলে ইলমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
একটি মত হলো, এই বিশেষণগুলোর মোউসুফ বা যার জন্য প্রযোজ্য সে একই ব্যক্তি। কারণ কাফির তো জালিমও বটে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘আর কাফিররাই প্রকৃত জালিম।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৪) এবং সে ফাসিকও, যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘পক্ষান্তরে যারা ফাসিক হয়েছে তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম।’ (সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত ২০) অর্থাৎ তারা কুফরি করেছে।
অপর একটি মত হলো, এই বিশেষণগুলোর মোউসুফ বা যাদের জন্য প্রযোজ্য তারা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি, এবং বিশেষণগুলো বিচারের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য। আর এ মতটিই অগ্রগণ্য। এক্ষেত্রে তিন অবস্থায় কেউ কাফির বলে গণ্য হবে।
প্রথম অবস্থা হলো, যখন সে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানের পরিবর্তে অন্য কিছু দিয়ে বিচার করাকে জায়েয বলে বিশ্বাস করে। এর দলিল হলো আল্লাহর বাণী, ‘তবে কি তারা জাহেলী যুগের বিচার চায়?’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৫০) সুতরাং আল্লাহর বিধানের বিপরীত সকল বিচারই জাহেলী যুগের বিচার। কেননা এ বিষয়ে অকাট্য ইজমা প্রতিষ্ঠিত যে, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার বিপরীত কিছু দিয়ে বিচার করা জায়েয নয়। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানের বাইরে বিচার করাকে বৈধ ও জায়েয মনে করে, সে মুসলমানদের অকাট্য ইজমার বিরোধী। আর এমন ব্যক্তি কাফির ও মুরতাদ। যেমন কোনো ব্যক্তি যদি ব্যভিচার বা মদকে হালাল মনে করে, কিংবা রুটি বা দুধকে হারাম মনে করে বসে।
দ্বিতীয় অবস্থা হলো, যখন সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কারো বিধান আল্লাহর বিধানের মতই।
তৃতীয় অবস্থা হলো, যখন সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কারো বিধান আল্লাহর বিধানের চেয়ে উত্তম।
এর দলিল হলো আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘আল্লাহর চেয়ে অধিক উত্তম বিধান কে দিতে পারে দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য?’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৫০)
আয়াতটি এ কথা অন্তর্ভুক্ত করে যে, আল্লাহর বিধানই সর্বোত্তম বিধান। এর সমর্থনে আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক নন?’ (সূরা আত-তীন, আয়াত ৮) সুতরাং যখন আল্লাহই বিধানের দিক দিয়ে সর্বোত্তম এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক, তখন যে ব্যক্তি দাবি করে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যের বিধান আল্লাহর বিধানের সমান অথবা তার চেয়ে উত্তম, সে কাফির। কারণ সে কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল।
আর ব্যক্তি জালিম হয় যখন সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুযায়ী বিচার করাই সর্বোত্তম বিধান এবং তা বান্দা ও দেশের জন্য অধিকতর কল্যাণকর, আর তা বাস্তবায়ন করাই ওয়াজিব; কিন্তু যার বিপক্ষে বিচার করা হচ্ছে তার প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসা তাকে প্ররোচিত করল, ফলে সে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার বিপরীত বিচার করল; তাহলে সে জালিম।
আর ব্যক্তি ফাসিক হয় যখন সে নিজ মনের প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার বিপরীত বিচার করে; অথচ সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর বিধানই সত্য; কিন্তু সে তার বিপরীত বিচার করল নিজের প্রবৃত্তির তাড়নায়, অর্থাৎ সে যে বিধান দিয়েছে তার প্রতি ভালোবাসার কারণে।
আল্লাহর বিধানের প্রতি কোনো বিদ্বেষ না থাকা সত্ত্বেও বা এর দ্বারা কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য ছাড়াই, যেমন ঘুষ গ্রহণ করে কারো পক্ষে রায় দেওয়া, অথবা আত্মীয় বা বন্ধু হওয়ার কারণে, কিংবা এর বিনিময়ে কোনো প্রয়োজন পূরণের আশায় রায় দেওয়া, এবং এ জাতীয় অন্যান্য কারণে রায় দেওয়া; অথচ তার বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহর বিধানই সর্বোত্তম এবং তা অনুসরণ করা ওয়াজিব; তাহলে এ ব্যক্তি ফাসিক। যদিও সে একই সাথে জালিমও, কিন্তু তার ক্ষেত্রে ফাসিক বিশেষণটি জালিম বিশেষণের চেয়ে অগ্রগণ্য।
এবার যারা আইনগত বিধান রচনা করে, অথচ তারা আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানে এবং এও জানে যে এসব আইন আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী; তারা তো এসব আইন দিয়ে শরীয়তকে পরিবর্তন করে ফেলেছে। ফলে সে কাফির, কারণ সে আল্লাহর শরীয়ত ছেড়ে এই আইনের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি বরং তার ধারণা হয়েছে যে, এই আইন আল্লাহর শরীয়তের চেয়ে বান্দা ও দেশের জন্য অধিকতর কল্যাণকর। আর আমরা যখন বলি যে সে কাফির, তখন আমরা বুঝাই যে এই কাজ কুফরিতে পৌঁছে দেয়।
তবে যিনি এসব আইন রচনা করেছেন তিনি কখনো কখনো ওজরগ্রস্ত বলেও গণ্য হতে পারেন। যেমন তাকে ধোঁকা দেওয়া হলো, আর বলা হলো যে, এটি ইসলাম পরিপন্থী কিছু নয়, অথবা এটি মাসালিহে মুরসালার অন্তর্ভুক্ত, কিংবা এটি এমন একটি বিষয় যা ইসলাম মানুষের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
কিছু আলেম, যদিও তাঁরা ভুলের মধ্যে আছেন, বলেন যে, লেনদেনের বিষয়সমূহের সাথে শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং তা নির্ভর করে যুগের প্রয়োজনে অর্থনীতির সংশোধনের ওপর। কাজেই পরিস্থিতির দাবি যদি এ হয় যে, আমরা সূদের ব্যাংক স্থাপন করি বা জনগণের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করি, তাহলে এতে কোনো দোষ নেই।
এ বক্তব্য যে ভুল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদি তাঁরা ইজতিহাদকারী হয়ে থাকেন তবে আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করবেন, অন্যথায় তাঁরা মারাত্মক বিপদের মধ্যে আছেন। আর এদেরকে রাষ্ট্রের আলেম বলা সঙ্গত, মিল্লাতের আলেম নয়।
নিঃসন্দেহে শরীয়ত এসেছে ইবাদতসমূহের নিয়মনীতি নিয়ে যা বান্দা ও তার প্রতিপালকের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ করে, আর লেনদেনসমূহের নিয়মনীতি নিয়ে যা সৃষ্টির সাথে মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণ করে চুক্তি, বিবাহ, উত্তরাধিকার ও অন্যান্য ক্ষেত্রে। তাই শরীয়ত সকল দৃষ্টিকোণ থেকে পরিপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩)।
আর কী করে বলা হয় যে, লেনদেনের বিষয়গুলোর সাথে শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই, অথচ কুরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াতটি লেনদেনের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে? আর যদি লেনদেনের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধিব্যবস্থা না থাকত, তাহলে মানুষ ধ্বংস হয়ে যেত।
আমি একথা বলি না যে, ফকীহগণ যা বলেছেন তার সবই আমরা গ্রহণ করব; কারণ তাঁরা কখনও সঠিক বলতে পারেন, কখনও ভুলও বলতে পারেন। বরং আমাদের ওপর আবশ্যক হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। মানুষের মধ্যে যে সমস্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়, এমন কোনো অবস্থা নেই যা দূর করার ও সমাধান করার মতো নির্দেশনা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহয় বিদ্যমান নেই। কিন্তু ভুলটি হয় জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে, কিংবা অনুধাবনের স্বল্পতার কারণে, আর এটি অক্ষমতা; অথবা গভীর চিন্তা ও গবেষণার স্বল্পতার কারণে, আর এটি অবহেলা।
পক্ষান্তরে যখন মানুষ জ্ঞান ও অনুধাবনের তৌফিক লাভ করে এবং সত্যে পৌঁছানোর জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করে, তখন সে নিশ্চিতভাবেই তাতে পৌঁছতে পারে, এমনকি লেনদেনের বিষয়সমূহেও। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না?’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৮২) তিনি আরও বলেছেন, ‘তবে কি তারা এ বাণী নিয়ে গভীর চিন্তা করেনি?’ (সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত ৬৮) তিনি আরও বলেছেন, ‘এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা করে।’ (সূরা সোয়াদ, আয়াত ২৯) এবং তিনি বলেছেন, ‘আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনাস্বরূপ।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত ৮৯) সুতরাং মানুষের দ্বীন বা দুনিয়াবি জীবনে যেকোনো কিছুরই প্রয়োজন হোক না কেন, কুরআন তার পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছে।
আর যে ব্যক্তি শরীয়ত বিরোধী আইন প্রণয়ন করে এবং দাবি করে যে, তা মাসালিহে মুরসালার অন্তর্ভুক্ত, সে তার দাবিতে মিথ্যাবাদী। কারণ মাসালিহে মুরসালা ও মুকাইয়াদা যদি শরীয়ত তা বিবেচনা করে এবং তার প্রতি নির্দেশ করে, তাহলে তা সত্য এবং শরীয়তেরই অংশ। আর যদি শরীয়ত তা বিবেচনা না করে, তাহলে তা কোনো কল্যাণ নয় এবং কখনোই তা কল্যাণ হতে পারে না। এ কারণেই সঠিক মত এই যে, মাসালিহে মুরসালা নামে কোনো দলিল নেই; বরং শরীয়ত যা কল্যাণ বলে গণ্য করেছে তাই কল্যাণ, আর শরীয়ত যা বাতিল করেছে তা কল্যাণ নয়, আর শরীয়ত যে বিষয়ে নীরব থেকেছে তা ক্ষমার্হ।
অনেক মানুষ মাসালিহে মুরসালার পরিধিকে প্রশস্ত করেছে। ফলে তারা এর মধ্যে কিছু আপত্তিকর মাসআলা, যেমন বিদআত ও অন্যান্য, প্রবেশ করিয়েছে। যেমন রাসূলের জন্মদিন উদযাপন; তারা ধারণা করল যে, এর মধ্যে প্রেরণার উদ্রেক হয় এবং মানুষকে উদ্দীপ্ত করে, কারণ তারা রাসূলুল্লাহ-এর স্মরণ ভুলে গেছে। কিন্তু এটি বাতিল; কারণ সকল মুসলিম প্রত্যেক নামাজেই সাক্ষ্য দেয় যে, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁরা তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করে। যে ব্যক্তির হৃদয় এর দ্বারা সজীব হয় না, অথচ সে তার প্রতিপালকের সামনে নামাজ আদায় করছে, কীভাবে তার হৃদয় সেসব মিথ্যা কবিতা পরিবেশনের মুহূর্তে সজীব হবে, যাতে রয়েছে বাড়াবাড়ি, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্বীকার করেন?! এটি একটি অনর্থ, কোনো কল্যাণ নয়।
সুতরাং মাসালিহে মুরসালা, যদিও কিছু বড় বড় মুজতাহিদ আলেম তা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তবুও নিঃসন্দেহে তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করা। কিন্তু এই মাসালিহগুলো সে সকল আলেমের অভিপ্রেত পথ ছাড়া ভিন্ন পথে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এতে বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। তাই একে সঠিক মানদণ্ডে পরিমাপ করতে হবে। যদি শরীয়ত তাকে কল্যাণ বলে গণ্য করে তবে তা গৃহীত হবে, অন্যথায় যেমন ইমাম মালিক বলেছেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তির বক্তব্যই গ্রহণ করা হবে এবং বর্জন করা হবে, কিন্তু এই কবরের অধিবাসী ছাড়া।’ আর এমন কিছু ব্যাপক মূলনীতি রয়েছে যার অধীনে খণ্ডিত বিষয়সমূহ প্রয়োগ করা হয়।
আর জেনে রাখা চাই যে, মানুষের ওপর আবশ্যক হলো সে সকল বিচারকার্যে তার প্রতিপালককে ভয় করবে। সুতরাং সে যেন তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত না দেয়, বিশেষ করে কাউকে কাফির বলার ব্যাপারে, যে বিষয়ে কিছু আগ্রহী ও আবেগপ্রবণ মানুষ কোনো চিন্তা-ভাবনা বা বিবেচনা ছাড়াই তা চালিয়ে দিচ্ছে। অথচ কোনো ব্যক্তি যখন কাউকে কাফির বলে অথচ সে ব্যক্তি তার যোগ্য নয়, তখন তার পরিণতি বক্তার নিজের ওপরই ফিরে আসে। আর কোনো ব্যক্তিকে কাফির বলার ওপর বহু বিধান নির্ভর করে; ফলে তার রক্ত ও সম্পদ বৈধ হয়ে যায় এবং তার ওপর কুফরির সকল বিধান প্রযোজ্য হয়। যেমনিভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর কাফিরের হুকুম লাগানো জায়েয নয় যতক্ষণ না তার ক্ষেত্রে তাকফিরের শর্তগুলো স্পষ্ট হয়, তেমনিভাবে যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কাফির বলেছেন তাকে কাফির বলতে কাপুরুষতা করাও উচিত নয়। তবে আমাদের ওপর আবশ্যক হলো, সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি ও অনির্দিষ্ট ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য করা। সুতরাং কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফির বলার জন্য দুটি বিষয় প্রয়োজন:
প্রথম বিষয় হলো, সে যে কাজটি করেছে তা কুফরির কারণ হয় তা সাব্যস্ত হওয়া।
দ্বিতীয় বিষয় হলো, তার উপর তাকফিরের শর্তগুলো প্রয়োগ হওয়া, আর তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো এ জ্ঞান থাকা যে, এটি কুফরির কাজ। কেননা যদি সে অজ্ঞ থাকে, তাহলে তাকে কাফির বলা হবে না। এ কারণেই আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, দণ্ডবিধি কার্যকর করার অন্যতম শর্ত হলো অপরাধীর তার নিষেধাজ্ঞার জ্ঞান থাকা। এটি তো দণ্ডবিধি কার্যকর করার শর্ত, অথচ তাকফির তো নয়। আর তাকফিরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা আরও অধিকতর আবশ্যক ও অগ্রগণ্য।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে মানুষের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত না থাকে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৬৫) এবং তিনি বলেছেন, ‘আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কখনও শাস্তি প্রদানকারী নই।’
আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন নন যে, কোনো জাতিকে পথনির্দেশ প্রদানের পর পুনরায় পথভ্রষ্ট করবেন, যতক্ষণ না তাদের জন্য সুস্পষ্ট করে দেন যে, তারা কী থেকে তাকওয়া অবলম্বন করবে।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত ১১৫) আর শর্তাবলী বিদ্যমান থাকলেও প্রতিবন্ধকতাগুলো অনুপস্থিত থাকা আবশ্যক। কেননা কোনো ব্যক্তি যদি কুফরির কারণ হয় এমন কাজ করেও বসে বাধ্য হয়ে বা বিহ্বল হয়ে, তাহলে সে কাফির বলে গণ্য হবে না। এর দলিল আল্লাহর বাণী, ‘যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করল, কিন্তু যে বাধ্য হলো অথচ তার অন্তর ঈমানে প্রশান্ত, (সে ভিন্ন কথা)।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত ১০৬) আরও দলিল হল সেই ব্যক্তির বক্তব্য, যে তার হারানো জন্তুটিকে মরুভূমিতে পেয়ে গিয়েছিল (এবং অত্যধিক আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে ফেলেছিল), ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা আর আমি তোমার প্রতিপালক।’ সে তীব্র আনন্দের কারণে ভুল করে ফেলেছিল, ফলে তাকে এজন্য অপরাধী গণ্য করা হয়নি।[1]মাজমু ফাতাওয়া ইবনে উছাইমিন, খণ্ড ৯-১০, পৃষ্ঠা ৭৪০-৭৪৫
আরবিঃ
قال الشيخ ابن عثيمين:
فائدة :
وصف الله الحاكمين بغير ما أنزل الله بثلاثة أوصاف :
– ۱ قال تعالى : ومن لم يحكم بما أنزل الله فأولئك هم الكافرون) [المائدة: ٤٤] .
– ۲ وقال تعالى : ومن لم يحكم بما أنزل الله فأولئك هم الظالمون) [المائدة: ٤٥] .
-۳ وقال تعالى : ومن لم يحكم بما أنزل الله فأولئك هم الفاسقون) [المائدة ٤٧] .
واختلف أهل العلم في ذلك :
فقيل : إن هذه الأوصاف الموصوف واحد ؛ لأن الكافر ظالم؛ لقوله
تعالى : والكافرون هم الظالمون) [البقرة: ٢٥٤]، وفاسق ؛ لقوله تعالى : وأما الذين فسقوا فمأواهم النار ) [السجدة: ٢٠]؛ أي: كفروا
وقيل: إنها الموصوفين متعددين، وإنها على حسب الحكم، وهذا هو الراجح . فيكون كافراً في ثلاثة أحوال:
ا. إذا اعتقد جواز الحكم بغير ما أنزل الله، بدليل قوله تعالى : أفحكم الجاهلية يبغون) [المائدة: ٥٠] ، فكل ما خالف حكم الله ؛ فهو من حكم الجاهلية، بدليل الإجماع القطعي على أنه لا يجوز الحكم بغير ما أنزل الله فالمحل والمبيح للحكم بغير ما أنزل الله مخالف لإجماع المسلمين القطعي، وهذا كافر مرتد، وذلك كمن اعتقد حل الزنا أو الخمر أو تحريم الخبز أو اللبن.
ب -إذا اعتقد أن حكم غير الله مثل حكم الله .
ج – إذا اعتقد أن حكم غير الله أحسن من حكم الله .
بدليل قوله تعالى : ومن أحسن من الله حكماً لقوم يوقنون) [المائدة: ٥٠]؛
فتضمنت الآية أن حكم الله أحسن الأحكام، بدليل قوله تعالى مقرراً ذلك : أليس الله بأحكم الحاكمين) [التين : ] ، فإذا كان الله أحسن الحاكمين أحكاماً وهو أحكم الحاكمين؛ فمن ادعى أن حكم غير الله مثل حكم الله أو أحسن فهو كافر لأنه مكذب للقرآن .
ويكون ظالماً : إذا اعتقد أن الحكم بما أنزل الله أحسن الأحكام، وأنه أنفع للعباد والبلاد، وأنه الواجب تطبيقه، ولكن حمله البغض والحقد للمحكوم عليه حتى حكم بغير ما أنزل الله ؛ فهو ظالم .
ويكون فاسقاً : إذا كان حكمه بغير ما أنزل الله لهوى في نفسه مع اعتقاده أن حكم الله هو الحق، لكن حكم بغيره لهوى في نفسه؛ أي: محبة لما حكم به
لا كراهة لحكم الله ولا ليضر أحداً به مثل : أن يحكم لشخص الرشوة رشي إياها، أو لكونه قريباً أو صديقاً، أو يطلب من ورائه حاجة، وما أشبه ذلك مع اعتقاده بأن حكم الله هو الأمثل والواجب اتباعه؛ فهذا فاسق، وإن كان أيضاً ظالماً، لكن وصف الفسق في حقه أولى من وصف الظلم .
أما بالنسبة لمن وضع قوانين تشريعية مع علمه بحكم الله وبمخالفة هذه القوانين لحكم الله ؛ فهذا قد بدل الشريعة بهذه القوانين، فهو كافر لأنه لم يرغب بهذا القانون عن شريعة الله إلا وهو يعتقد أنه خير للعباد والبلاد من شريعة الله، وعندما نقول بأنه كافر ؛ فنعني بذلك أن هذا الفعل يوصل إلى الكفر .
ولكن قد يكون الواضع له معذوراً، مثل أن يغرر به كأن يقال: إن هذا لا يخالف الإسلام، أو هذا من المصالح المرسلة، أو هذا مما رده الإسلام إلى الناس .
فيوجد بعض العلماء وإن كانوا مخطئين – يقولون : إن مسألة المعاملات لا تعلق لها بالشرع، بل ترجع إلى ما يصلح الاقتصاد في كل زمان بحسبه، فإذا اقتضى الحال أن نضع بنوكاً للربا أو ضرائب على الناس؛ فهذا لا شيء فيه .
وهذا لا شك في خطئه؛ فإن كانوا مجتهدين غفر الله لهم، وإلا ؛ فهم على خطر عظيم، واللائق بهؤلاء أن يُلَقَّبوا بأنهم من علماء الدولة لا علماء الملة .
ومما لا شك فيه أن الشرع جاء بتنظيم العبادات التي بين الإنسان وربه والمعاملات التي بين الإنسان مع الخلق في العقود والأنكحة والمواريث وغيرها ؛ فالشرع كامل من جميع الوجوه، قال تعالى : اليوم أكملت لكم دينكم [المائدة : ٣] .
وكيف يقال : إن المعاملات لا تعلق لها بالشرع وأطول آية في القرآن نزلت في المعاملات، ولولا نظام الشرع في المعاملات لفسد الناس؟!
وأنا لا أقول : نأخذ بكل ما قاله الفقهاء؛ لأنهم قد يصيبون وقد يخطئون، بل يجب أن نأخذ بكل ما قاله الله ورسوله ، ولا يوجد حال من الأحوال تقع بين الناس إلا في كتاب الله وسنة رسوله ما يزيل إشكالها ويحلها، ولكن الخطأ إما من نقص العلم أو الفهم، وهذا قصور، أو نقص التدبر ؛ وهذا تقصير .
أما إذا وفق الإنسان بالعلم والفهم وبذل الجهد في الوصول إلى الحق؛ فلا بد أن يصل إليه حتى في المعاملات، قال تعالى : أفلا يتدبرون القرآن [النساء : ۸۲]، وقال تعالى : أفلم يدبروا القول [المؤمنون: ٦٨]، وقال تعالى : كتاب أنزلناه إليك مبارك ليدبروا آياته) [ص: ۲۹]، وقال تعالى : ونزلنا عليك الكتاب تبياناً لكل شيء [النحل: ۸۹]، فكل شيء يحتاجه الإنسان في دينه أو دنياه؛ فإن القرآن بينه بياناً شافياً .
ومن سن قوانين تخالف الشريعة وادعى أنها من المصالح المرسلة؛ فهو كاذب في دعواه لأن المصالح المرسلة والمقيدة إن اعتبرها الشرع ودل عليها فهي حق ومن الشرع، وإن لم يعتبرها فليست مصالح ولا يمكن أن تكون كذلك، ولهذا كان الصواب أنه ليس هناك دليل يسمى بالمصالح المرسلة، بل ما اعتبره الشرع؛ فهو مصلحة، وما نفاه ؛ فليس بمصلحة، وما سكت عنه؛ فهو عفو .
والمصالح المرسلة توسع فيها كثير من الناس؛ فأدخل فيها بعض المسائل المنكرة من البدع وغيرها؛ كعيد ميلاد الرسول فزعموا أن فيه شحذاً للهمم وتنشيطاً للناس لأنهم نسوا ذكر رسول الله الله ، وهذا باطل؛ لأن جميع المسلمين في كل صلاة يشهدون أن محمداً عبده ورسوله ويصلون عليه، والذي لا يحيى قلبه بهذا وهو يصلي بين يدي ربه كيف يحيى قلبه بساعة يُؤتَى فيها بالقصائد الباطلة التي فيها من الغلو ما ينكره رسول الله ﷺ ؟! فهذه مفسدة وليست بمصلحة .
فالمصالح المرسلة وإن وضعها بعض أهل العلم المجتهدين الكبار؛ فلا شك أن مرادهم نصر الله ورسوله، ولكن استخدمت هذه المصالح في غير ما أراده أولئك العلماء وتوسع فيها، وعليه؛ فإنها تُقاس بالمعيار الصحيح، فإن اعتبرها الشرع قبلت، وإلا ؛ فكما قال الإمام مالك: «كل أحد يؤخذ من قوله ويرد إلا صاحب هذا القبر، وهناك قواعد كليات تطبق عليها الجزئيات .
وليعلم أن يجب على الإنسان أن يتقي ربه في جميع الأحكام؛ فلا يتسرع في البت بها خصوصاً في التكفير الذي صار بعض أهل الغيرة والعاطفة يطلقونه بدون تفكير ولا روية، مع أن الإنسان إذا كفر شخصاً ولم يكن الشخص أهلاً له ؛ عاد ذلك إلى قائله، وتكفير الشخص يترتب عليه أحكام كثيرة؛ فيكون مباح الدم والمال، ويترتب عليه جميع أحكام الكفر، وكما لا يجوز أن نطلق الكفر على شخص معين حتى يتبين شروط التكفير في حقه يجب أن لا تجبن عن تكفير من كفّره الله ورسوله ، ولكن يجب أن نفرق بين المعين وغير المعين ؛ فالمعين يحتاج الحكم بتكفيره إلى أمرين :
– ۱ ثبوت أن هذه الخصلة التي قام بها مما يقتضي الكفر .
– ۲ انطباق شروط التكفير عليه، وأهمها العلم بأن هذا مكفر، فإن كان جاهلاً؛ فإنه لا يكفر، ولهذا ذكر العلماء أن من شروط إقامة الحد أن يكون عالماً بالتحريم، هذا وهو إقامة حد وليس بتكفير، والتحرز من التكفير أولى وأحرى .
قال تعالى: رسلاً مبشرين ومنذرين لئلا يكون للناس على الله حجة بعد الرسل) [النساء: ١٦٥]، وقال تعالى: ﴿وما كنا معذبين حتى نبعث رسولا) [الإسراء : ١٥]، وقال تعالى : وما كان الله ليضل قوماً بعد إذ هداهم حتى يبين لهم ما يتقون) [التوبة: ١١٥]، ولا بد مع توفر الشروط من عدم الموانع، فلو قام الشخص بما يقتضي الكفر إكراها أو ذهولاً لم يكفر؛ لقوله تعالى: ﴿من كفر بالله من بعد إيمانه إلا من إكراه وقلبه مطمئن بالإيمان) [النحل: ١٠٦]؛ ولقول الرجل الذي وجد دابته في مهلكة : اللهم ! أنت عبدي وأنا ربك؛ أخطأ من شدة الفرح» (١) ، فلم يؤاخذ بذلك .
مجموع فتاوى ابن عثيمين، جز ٩-١٠، ص ٧٤٠-٧٤٥
কুরআন বিরোধী সকল আইনের কোনো কল্যাণ নেই
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ
এই মূলনীতিতে, ‘নিশ্চয় এই কুরআন সেই পথের দিশা দেয় যা সর্বাধিক সুপ্রতিষ্ঠিত’ (সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৯), আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআনের পরিপন্থী সকল আইনের কোনো কল্যাণ নেই। আর যদি তাতে কোনো কল্যাণ থেকেও থাকে, তবু কুরআনের কল্যাণই উত্তমতর ও অধিকতর উপকারী। ‘তারা তোমার কাছে কোনো উপমা নিয়ে আসে না, কিন্তু আমি তোমার কাছে নিয়ে আসি সত্য এবং অপেক্ষাকৃত সুন্দর ব্যাখ্যা’ (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৩৩)। ‘আর যদি তারা সে উপদেশ অনুযায়ী আমল করত যা তাদের দেওয়া হয়েছে, তাহলে তা তাদের জন্য কল্যাণকর হতো এবং সুদৃঢ়তার দিক দিয়ে অধিকতর মজবুত হতো। আর তখন অবশ্যই আমি তাদের আমার কাছ থেকে মহাপুরস্কার দান করতাম। এবং অবশ্যই আমি তাদের সরল পথ দেখিয়ে দিতাম’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৬-৬৮)। সুতরাং সারকথা হলো, বিশ্বাস, বক্তব্য, কর্ম, চরিত্র, নীতিমালা, লেনদেন, বর্জনীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহের মধ্যে যা-ই অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত, কুরআন তারই দিশা দেয়।
আমরা এ থেকে কতিপয় মহান মূলনীতি গ্রহণ করি। তন্মধ্যে একটি হলো, যখন দুটি কল্যাণ পরস্পর বিরোধী হয়, যার একটি অধিকতর কল্যাণকর, তখন আমরা অধিকতর কল্যাণকরটি গ্রহণ করি। আরেকটি হলো, যখন দুটি দলিল পরস্পর বিরোধী হয়, যার একটি কঠোরতর, তখন আমরা সহজতরটি গ্রহণ করি। সুতরাং যা-ই অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত, কুরআন তারই দিশা দেয়। আর এর বিপরীতটিও ঠিক বিপরীত। অর্থাৎ যা-ই অধিকতর বাঁকা, নিকৃষ্টতর ও মন্দতর, কুরআন তার দিশা দেয় না; বরং তার বিপরীতের দিশা দেয়।[2]হিদায়াতুল কুরআন, ১৮৩
।وقال الشيخ ابن عثيمين رحمه الله:
في هذه القاعدة : ﴿ إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ ﴾ [الإسراء : ٩ ] يتبين لنا أن جميع القوانين المخالفة للقرآن كلها لا خير فيها وأنه إن قدر فيها الخير ، فما في القرآن خير وأشد وأفيد : ﴿ وَلَا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيرًا ﴾ [ الفرقان : ٣٣ ] ، وَلَوْ أَنَّهُمْ فَعَلُوا مَا يُوعَظُونَ بِهِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ وَأَشَدَّ تَثْبِيتًا – وَإِذًا لَآتَيْنَاهُمْ مِنْ لَدُنَّا أَجْرًا عَظِيمًا . وَلَهَدَيْنَاهُمْ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا ﴾ [ النساء : ٦٦ – ٦٨ ] ، فالحاصل أن كل ما كان أقوم في العقائد والأقوال والأعمال والأخلاق والسياسات والمعاملات والمتروكات والمنهيات ، فإن القرآن يهدي إليها . ونأخذ من هذا قواعد عظيمة منها إذا تعارض مصلحتان أحدهما أنفع أخذنا بالأنفع ومنها إذا تعارض نصان أحدهما أشد أخذنا بالأخف، فكل ما كان أقوم كان القرآن يهدي إليه ، والعكس بالعكس ، فكل ما كان أعوج وأردأ وأسوأ فإن القرآن لا يهدي إليه بل يهدي إلى ضده .
هداية القرآن، ١٨٣
এই সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি একটি মূলগত উসূলি (মূলনীতিগত) পয়েন্ট উপস্থাপন করে। শায়েখ এখানে বলছেন যে কুরআন বিরোধী সকল আইনে কোনো কল্যাণ নেই, আর যদি কোনো বাহ্যিক কল্যাণ থেকে থাকেও, সেটি কুরআনের বিধানের তুলনায় অপ্রতুল।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি, কারণ আধুনিক আইন প্রণয়নের পক্ষে প্রায়ই বলা হয় যে মানবরচিত আইনে “ব্যবহারিক কল্যাণ” রয়েছে। শায়েখ এই যুক্তিকে মূলে কেটে দিয়ে বলছেন: ধরে নিলাম কল্যাণ আছে, তবুও কুরআনের বিধানেই সেই কল্যাণ অধিকতর ও পরিপূর্ণ রূপে বিদ্যমান।
দুটি উসূলি মূলনীতি এখানে উল্লেখযোগ্য: (১) দুটি কল্যাণের মধ্যে বেশি কল্যাণকরটি গ্রহণ করো, (২) দুটি দলিলের বিরোধে সহজতরটি নাও। এই নীতিদুটি প্রমাণ করে যে শরীয়তের ভেতরে নমনীয়তার ব্যবস্থা আছে, তাই শরীয়তকে “অপ্রচলিত” বলে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিধান দেওয়ার ক্ষেত্রে শিরক: রুবুবিয়্যাতের সাথে সম্পর্ক
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) অন্যত্র বলেনঃ
আর যদি কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করে, তাহলে সে কাফির, এমন কুফরির সাথে যা তাকে মিল্লাত থেকে বের করে দেয়, তা সে বিশ্বাসের দ্বারা হোক, কথার দ্বারা হোক, অথবা কাজের দ্বারা হোক।
বিশ্বাসের দ্বারা শিরক হলো, যেমন কেউ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির কাজে, অথবা বিশ্বজগতের পরিচালনায়, অথবা রাজত্বে, অথবা ইবাদতে কোনো শরীক আছে, কিংবা এ জাতীয় অন্য কিছু।
কাজের দ্বারা শিরক হলো, যেমন মূর্তিকে সিজদা করা।
কথার দ্বারা শিরক হলো, যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা, অথবা তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, অথবা বলা, ‘লাব্বাইক, তোমার কোনো শরীক নেই, তবে একটি শরীক যে তোমারই, তুমি তার মালিক এবং সে যা কিছুর মালিক তাও তোমার’, এবং এ জাতীয় অন্য কিছু।
সুতরাং শিরক করা, তা অন্তরের সাথে হোক, কথার সাথে হোক, কিংবা কাজের সাথে হোক, তাকে ইসলাম থেকে মুরতাদ হওয়া বলে গণ্য করা হবে। আর আল্লাহর সাথে শিরক করার অন্তর্ভুক্ত হলো, বিধান দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করা। অর্থাৎ সে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য মানুষদের জন্য আইন প্রবর্তন করার অধিকার আছে, যা তারা আল্লাহর শরীয়তের স্থলে স্থাপন করবে। এর দলিল আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছিল এবং মারইয়াম-পুত্র মসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করা ছাড়া আর কোনো নির্দেশপ্রাপ্ত হয়নি।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৩১) তারা তো আল্লাহ যা হারাম করেছিলেন তা হালাল বলে গণ্য করত, আর তাকে হালাল করে নিত, এবং আল্লাহ যা হালাল করেছিলেন তা হারাম বলে গণ্য করত, আর তাকে হারাম করে নিত। আর যারা এসব আইন প্রণয়ন করেছে তারা নিজেদের উপাস্যতার আসনে অথবা প্রতিপালকত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। অর্থাৎ সে নিজেকে আইনপ্রণেতা প্রতিপালক বানিয়ে নিয়েছে। আর যে ব্যক্তি এক্ষেত্রে তার অনুসরণ করে এবং তাতে তার সাথে একমত হয়, সেও মুশরিক। কারণ সে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাকে প্রতিপালকের আসনে বসিয়েছে।[3]শারহুল মুমতি’ আলা যাদিল মুস্তাকনি’, ১৪/৪০৯
আরবিঃ
وإذا أشرك بالله فهو كافر كفراً مخرجاً عن الملة، سواء كان باعتقاد، أو بقول، أو بفعل
فالاعتقاد بأن يعتقد أن الله تعالى شريكاً في الخلق، أو في التدبير، أو في الملك، أو في العبادة، أو ما أشبه ذلك
وبالفعل مثل أن يسجد للصنم.
وبالقول مثل أن يدعو غير الله، أو يستغيث به، أو يقول : لبيك لا شريك لك إلا شريكاً هو لك ، تملكه وما ملك، وما أشبه ذلك.
فالإشراك سواء كان بالقلب، أو بالقول، أو بالفعل يعتبر ردة عن الإسلام، ومن الإشراك بالله أن يشرك مع الله غيره في الحكم، بأن يعتقد أن لغير الله أن يشرع للناس قوانين، يُحِلُّونها محل شريعة الله، لقوله تعالى : اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أرباباً من دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَاحِدًا ﴾ [التوبة : (۳۱] ، وكانوا يحلون ما حرم الله فيحلونه ويحرمون ما أحل الله فيحرمونه، أما من سن هذه القوانين فقد جعل نفسه في مقام الألوهية، أو في مقام الربوبية، يعني جعل نفسه رباً مشرعاً، ومن أطاعه في ذلك ووافقه عليه فهو مشرك؛ لأنه جعله بمنزلة الرب في التشريع.
شرح الممتع على زاد المستقنع، ١٤/٤٠٩
তাশরি’র তথা সংবিধান প্রণয়নের শিরক
এই উদ্ধৃতিতে শায়েখ বিষয়টিকে শিরকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। প্রথম উদ্ধৃতিতে ছিল কুফর-জুলুম-ফিসকের ত্রিভাজন; এখানে শায়েখ মূলে একটি আকিদাগত সমস্যা চিহ্নিত করেছেন: আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কাউকে তাশরি’র (আইন প্রণয়নের) ক্ষমতা দেওয়া হলো রুবুবিয়্যাতে শিরক।
এখানে সূরা আত-তাওবার ৩১ নম্বর আয়াত ও আদি ইবনে হাতিমের হাদীসের আলোকে স্পষ্ট করা হয়েছে: আহবার ও রুহবানকে “রব” গ্রহণ করার অর্থ তাদের সামনে নামাজ পড়া নয়, বরং তাদের হালাল-হারামের মানদণ্ড মানা। এই একই নীতি আধুনিক আইন প্রণেতাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
উল্লেখযোগ্য যে শায়েখ এখানে শুধু প্রণেতার নয়, অনুসরণকারীরও শিরক হওয়ার কথা বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি এক্ষেত্রে তার অনুসরণ করে এবং তাতে তার সাথে একমত হয়, সেও মুশরিক।” এই অনুসরণকারী কে? যে জেনেশুনে, বিশ্বাসের স্তরে এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নেয়।
মানবরচিত আইন ও তাগুতের কাছে বিচার
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ
তিনি বলেছেন, ‘অথবা অপর কেউ’, অর্থাৎ বাদশাহ বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কেউ তাকে শ্রমিক নিয়োগ করল। যেমন তুমি কাউকে তোমার জন্য গাছে চড়তে বা কূপে নামতে ভাড়া করলে, আর সে মারা গেল, তাহলে তোমার উপর কোনো জরিমানা নেই। কেননা সে নিজের সম্মতি ও ইচ্ছায় কাজটি করেছে। এর দ্বারা আমরা সেই আইনগুলোর ভুল বুঝতে পারি, যা কোনো কোনো দেশে প্রণীত হয়েছে, যেখানে বলা হয় কোনো কোম্পানির শ্রমিক সর্বাবস্থায় ক্ষতিপূরণপ্রাপ্ত হবে, এমনকি যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক, জ্ঞানবান ও স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী হয়, আর যদি সে ধোঁকাপ্রদত্তও না হয়ে থাকে, বরং সে নিজের কাজ ও তার ঝুঁকি যদি কোনো ঝুঁকি থাকে সে সম্পর্কে অবগত থেকেই কাজ করে থাকে। এটি একটি তাগুতী বিধান, যা ইসলামী শরীয়তের বিধানের পরিপন্থী। এ আইন অনুযায়ী আমল করা জায়েয নয়, বরং আবশ্যক হলো আল্লাহর শরীয়তের দাবি অনুযায়ী এতে বিচার করা।
বলা হবে যে, এ শ্রমিক ক্ষতিপূরণযোগ্য নয়; তবে যদি তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়ে থাকে, তাহলে সে ক্ষতিপূরণ পাবে। তুমি যদি বলো, এটা কি সার্বজনীন আন্তর্জাতিক আইন নয়? এর উত্তর হলো, না; বরং সার্বজনীন আন্তর্জাতিক আইন হলো আল্লাহর আইন। আর আল্লাহর বান্দাদের মাঝে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করার অধিকার কোনো বান্দার নেই, যা আল্লাহর শরীয়তে নেই। সুতরাং বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহরই, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হুকুম তো কেবল আল্লাহরই’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৪০)। অতএব যে কোনো ব্যক্তি আল্লাহর শরীয়তের পরিপন্থী আইন রচনা করে, সে নিজের জন্য প্রতিপালকত্বের একাংশ নির্ধারণ করল এবং আল্লাহর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তার শরিক হলো। কাজেই আল্লাহর বান্দাদের মাঝে আল্লাহর শরীয়তের দাবি অনুযায়ী ছাড়া বিচার করার ক্ষমতা কারো নেই। আর এ ভিত্তিতে আমরা বলি, সাধারণ আন্তর্জাতিক আইন এবং স্বতন্ত্র বা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আইন বলতে একমাত্র আল্লাহর আইন, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন।
আর আল্লাহর আইন ছাড়া সকল আইনই বাতিল। কেননা তা ত্রুটিপূর্ণ ও অপূর্ণ। এমনকি যদি দুনিয়ার সমস্ত বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার বৈধতার ব্যাপারে একমত হয়, তবুও তা ত্রুটিপূর্ণ ও অপূর্ণ, যা কোনো উদ্দেশ্যই পূরণ করতে পারে না। যদি একদিক থেকে কোনো উদ্দেশ্য পূরণও করে, তবু অন্য দিক থেকে আরও অনেক উদ্দেশ্য বিনষ্ট করে ফেলে। আর যদি ধরে নেওয়া হয় যে, তা একদিক থেকে কোনো উদ্দেশ্য পূরণও করে, তবু তা শুধুমাত্র বিশেষ কিছু মানুষের জন্য, বিশেষ এক স্থানে এবং বিশেষ এক সময়ে পূরণ করে থাকে। পক্ষান্তরে যেসব বিধান সর্বস্থান ও সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য, তা কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলার বিধানসমূহই। আর এর দ্বারা আমরা এ পথ অবলম্বন করার গুরুতর বিপদ উপলব্ধি করতে পারি, অর্থাৎ আমরা শরীয়ত প্রবর্তন করেনি এমন মানবরচিত আইন প্রণয়ন করব এবং তা দিয়ে আল্লাহর বান্দাদের মাঝে বিচার করব।
এবং আমরা তাদের বিচারকার্যকে ঐসব আইনের দিকে ফিরিয়ে নিই, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহর দিকে নয়। অথচ আল্লাহ তাআলা এদের অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তুমি কি তাদের দেখনি, যারা দাবি করে যে, তারা ঈমান এনেছে সে বিষয়ের প্রতি যা তোমার প্রতি নাজিল করা হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা নাজিল করা হয়েছিল; (অথচ) তারা তাগুতের কাছে বিচার চায়?’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬০)। তুমি ‘তারা দাবি করে যে তারা ঈমান এনেছে’ কথাটি গভীরভাবে চিন্তা কর। প্রকৃতপক্ষে তারা ঈমানদার নয়, বরং তা নিছকই দাবি মাত্র। আর দাবি কখনও বাস্তবের সাথে মিলতে পারে, আবার নাও মিলতে পারে। তারা তাদের মুখে দাবি করছে যে, তারা ঈমান এনেছে তোমার প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা নাজিল করা হয়েছিল।
কিন্তু তাদের অন্তর এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা চায়’, আর ইচ্ছার স্থান হলো অন্তর, ‘তাগুতের কাছে বিচার চায়, অথচ তাদের আদেশ করা হয়েছিল তাকে অস্বীকার করতে।’ যদি তারা তাদের ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী হতো, তবে তারা এই তাগুতকে অস্বীকার করত এবং তার কাছে বিচার প্রার্থনা করতে চাইত না। ‘আর শয়তান তাদের সুদূর পথভ্রষ্টতায় ফেলে দিতে চায়।’ সুতরাং এ হিসেবে তারা শয়তানের ইচ্ছারই অনুসারী, দয়াময়ের ইচ্ছার নয়। ‘আর যখন তাদের বলা হয়, এসো আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে,’ অর্থাৎ কিতাব ও সুন্নাহর দিকে, তখন তারা সরাসরি বলে না, ‘না’, যাতে তাদের কুফরি প্রকট না হয়ে যায়। বরং ‘তারা তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নেয়’, অর্থাৎ তারা বিমুখ হয়। ‘কিন্তু তখন কী অবস্থা হবে যখন তাদের কৃতকর্মের কারণে কোনো মুসিবত তাদের ওপর আপতিত হয়, তারপর তারা তোমার কাছে আসে আল্লাহর শপথ করে বলে, আমরা তো কেবল মঙ্গল ও সামঞ্জস্য বিধান করতে চেয়েছিলাম।’ অর্থাৎ আমরা চেয়েছিলাম যে, আমরা মঙ্গল সাধন করি এবং শরীয়ত ও মানবরচিত আইনের মাঝে সমন্বয় বিধান করি। কিন্তু তারা কি সত্যবাদী?
তিনি সুবহানাহু বলেছেন, ‘এরাই তারা, যাদের অন্তরে কী আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তাদের উপদেশ দাও এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে হৃদয়স্পর্শী কথা বল। আর আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তারা যেন আল্লাহর আদেশে আনুগত্য প্রাপ্ত হয়, এই জন্যই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৩-৬৪) তাকে পাঠানো হয়নি যেন তার বিধানের সাথে উপহাস করা হয়, তা বর্জন করা হয় এবং তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনা করতে চাওয়া হয়।[4]শারহুল মুমতি’ আলা যাদিল মুস্তাকনি’, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ১১২-১১৪
আরবিঃ
قوله: «أو غيره» أي: لو استأجره غير السلطان، فلو استأجرت إنساناً أن يصعد لك شجرة أو أن ينزل بئراً، فهلك فإنه لا ضمان عليك؛ لأنه فعل ذلك برضاه واختياره. وبهذا نعرف خطأ تلك القوانين التي قُننت في بعض الدول، أن العامل لدى الشركات يكون مضموناً بكل حال، حتى لو كان بالغاً عاقلاً مختاراً، وحتى لو كان غير مغرور، بأن عرف عمله وخطره إن كان فيه خطورة، فهذا حكم طاغوتي مخالف لحكم الشريعة، ولا يجوز العمل به، ويجب أن يحكم فيه بمقتضى شريعة الله، فيقال: إن هذا العامل غير مضمون؛ إلَّا إذا كان مكرهاً على العمل فيكون مضموناً. فإن قلت: أليس هذا قانوناً دولياً عاماً؟ الجواب: لا بل القانون الدولي العام هو قانون الله – عزّ وجل، وليس لأحد من عباد الله أن يُقنّن في عباد الله ما ليس في شريعة الله، فالحكم لله – عزّ وجلَّ ـ وحده، كما قال تعالى: ﴿إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ﴾ [يوسف: ٤٠]، فأي إنسان يشرع قوانين تخالف شريعة الله فقد اتخذ لنفسه جانباً من الربوبية، وشارك الله – تعالى – فيما هو من خصائصه، فلا أحد يحكم في عباد الله إلَّا بما اقتضاه شرع الله. وعلى هذا نقول: إن القانون الدولي العام والشعبي الإفرادي هو قانون الله عزّ وجلَّ، الذي شرعه لعباده.
وكل القوانين سوى ذلك فإنها باطلة؛ لأنها ناقصة وقاصرة، حتى لو اجتمع أذكياء العالم على مشروعيتها فإنها ناقصة قاصرة، لا تفي بأي غرض من الأغراض، وإن وَفَتْ بغرض من جانب هدمت أغراضاً أخرى من جوانب أخرى، وإن قدر أنها تخدم غرضاً من جانب، فإنها لا تخدم هذا الغرض إلا في أناس معينين، وفي مكان معين وفي زمان معين، أما الأحكام الصالحة لكل زمان ومكان فإنها أحكام الله – سبحانه وتعالى ـ، وبهذا نعرف خطورة الذهاب إلى هذا المذهب وهي أن نسن القوانين الوضعية التي لم يضعها الشرع ونحكم بها عباد الله، ونجعل التحاكم إليها لا إلى كتاب الله وسنة رسول الله، وقد نوه الله – تعالى – عن أحوال هؤلاء فقال: ﴿أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ﴾ [النساء: ٦٠]، وتأمل كلمة ﴿يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا﴾، فهم في الحقيقة غير مؤمنين، بل هو زعم فقط، والزعم قد يوافق الواقع وقد لا يوافقه، فهم يزعمون أنهم آمنوا بما أنزل إليك، وما أنزل من قبلك بألسنتهم، لكن قلوبهم على العكس من ذلك لقوله ﴿يُرِيدُونَ﴾ والإرادة محلها القلب ﴿أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ﴾، ولو كانوا صادقين في إيمانهم لكفروا بهذا الطاغوت، ولم يريدوا أن يتحاكموا إليه، ﴿وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا﴾، وعلى هذا فهم موافقون لمراد الشيطان لا لمراد الرحمن، ﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ الله وَإِلَى الرَّسُولِ﴾ أي إلى الكتاب والسنة فلا يُصرحون بقولهم: لا، حتى لا يظهر كفرهم، ولكنهم يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا أي: يعرضون، فَكَيْفَ إِذَا أَصَبَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَنَنَا وَتَوْفِيقًا، أي: أردنا أن نحسن وأن نوفق بين الشريعة والوضيعة وهل هم صادقون؟ قال سبحانه: ﴿أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا﴾ وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللهِ [النساء: ٦٣ – ٦٤] لا ليتلاعب بأحكامه وتترك، ويراد التحاكم إلى الطاغوت.
شرح الممتع على زاد المستقنع،ج ١٤ , ص ۱۱۲-١١٤
“সার্বজনীন আন্তর্জাতিক আইন” দাবির খণ্ডন ও তাগুতের সংজ্ঞা
এই উদ্ধৃতিটা কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শায়েখ একটি সাধারণ ফিকহি মাসআলা দিয়ে শুরু করে সরাসরি আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের সমালোচনায় পৌঁছেছেন।
মূল ধারণাটা হলো: যে শ্রমিক জেনেশুনে, স্বেচ্ছায় ও বিনা জবরদস্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছে, সে মারা গেলে মালিকের উপর দিয়্যত নেই। কারণ সে নিজের সিদ্ধান্তেই কাজ করেছে। ইসলামী শরীয়তে ব্যক্তির ইচ্ছা ও দায়িত্বকে সম্মান করা হয়।
কিন্তু অনেক দেশের শ্রম আইনে বলা হয়: যেকোনো অবস্থায় কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য — এমনকি শ্রমিক জেনেশুনে ঝুঁকি নিলেও। শায়েখ এটিকে “তাগুতী বিধান” বললেন। কারণ এটা শরীয়তের মূলনীতির বিরোধী।
এখানে শায়েখ “সার্বজনীন আন্তর্জাতিক আইন” দাবির মূলে একটি দার্শনিক আঘাত করেছেন। তিনি বলছেন: যে আইন সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক ও সার্বজনীন, তা হলো আল্লাহর আইন — কারণ একমাত্র তাঁর আইনই সকল কাল, সকল স্থান ও সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। মানুষের বানানো আইন সর্বদা নির্দিষ্ট সময়ের, নির্দিষ্ট স্থানের ও নির্দিষ্ট মানুষের চিন্তার ফসল। তাই এটা “আন্তর্জাতিক” হওয়ার দাবি রাখে না।
সূরা নিসার ৬০ নম্বর আয়াতের বিশ্লেষণে শায়েখ একটি সূক্ষ্ম ব্যাকরণগত বিষয় তুলে ধরেছেন — “يَزْعُمُونَ” অর্থ দাবি করে, নিশ্চিতভাবে জানে না। এই শব্দটাই বলে দিচ্ছে তাদের ঈমান বাস্তবতার সাথে মেলে না। আর “يُرِيدُونَ” — ইচ্ছা করে শব্দটা হলো অন্তরের ক্রিয়া। অর্থাৎ তাগুতের কাছে বিচার চাওয়াটা তাদের মুখের কথা নয়, অন্তরের ইচ্ছা। এই পার্থক্যটা তাদের মুনাফিকির প্রমাণ।
মুসিবত ও বিপর্যয়ের কারণ: শরীয়ত থেকে বিচ্যুতি
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ
আমরা বলি, এই মুসিবত যা এই দেশগুলো ও তার আশপাশের এলাকাগুলোকে গ্রাস করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই যে তা আমাদের নিজেদেরই কৃতকর্মের ফল। এর কারণ জুলুম, কিছু শাসকের আল্লাহর শরীয়ত থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর শরীয়ত পরিপন্থী আইন ও বিধিব্যবস্থাকে বিচারকার্যে প্রয়োগ করা, আর কিছু মানুষের আল্লাহর আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পাপাচার, যেমন নামাজ নষ্ট করা, কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ এবং আরও অনেক কিছু।
আর আমরা যে বিষয়গুলো উল্লেখ করলাম, তা সৃষ্টিকর্তা আজ্জা ওয়াজাল্লার ক্রোধ উদ্রেক করে। আর যখন আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল্লা কোনো জাতির ওপর ক্রোধান্বিত হন, তখন তিনি তাদের ওপর এমন শাস্তি অবতীর্ণ করবেন যা প্রজ্ঞার সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।[5]মাজমু ফাতাওয়া ইবন উসাইমিন, খণ্ড ২৫, পৃষ্ঠা ৫৪৭
وقال أيضا:
فنقول: ما وقع من هذه المصيبة التي اجتاحت هذه البلاد وما جاورها لاشك أنها من عند أنفسنا بسبب الظلم وخروج بعض الحكام عن شريعة الله وتحكيمهم للقوانين والنظم المخالفة لشريعة الله وفسق بعض الناس بالخروج عن طاعة الله من إضاعة الصلوات، وإتباع الشهوات وغير ذلك.
وهذه الأمور التي ذكرنا تغضب الخالق عز وجل، وإذا غضب الله عز وجل على قوم، فإنه سوف ينزل بهم العذاب المطابق للحكمة تماماً.
مجموع فتاوى للعثيمين, 25\547
শায়েখ বলছেন: মুসলিম দেশগুলোয় যে বিপর্যয় ও মুসিবত আসছে, তার দুটি উৎস আছে। এক — শাসকের স্তরে শরীয়ত পরিপন্থী আইন প্রয়োগ। দুই — জনগণের স্তরে নামাজ নষ্ট করা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। দুটোই আল্লাহর ক্রোধের কারণ।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: শায়েখ শুধু শাসককে দায়ী করেননি, জনগণকেও দায়ী করেছেন। এটা একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, কারণ অনেকে শুধু শাসকের দোষ দেন, নিজেদের দায় স্বীকার করেন না। শায়েখের কথা হলো, উভয় স্তরের পাপই সামষ্টিক বিপর্যয়ের কারণ।
গাইরুল্লাহর আইনে কোনো ইনসাফ নেই
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ
অতঃপর তিনি এই সাদকা সম্পর্কে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘দুই ব্যক্তির মাঝে ন্যায়বিচার করা একটি সাদকা।’ অর্থাৎ দুই ব্যক্তি তোমার কাছে বিবাদ নিয়ে আসল, আর তুমি তাদের মাঝে ন্যায়বিচার করলে; তুমি তাদের মাঝে ইনসাফভিত্তিক ফয়সালা করলে। আর যা-ই শরীয়তের অনুকূল, তাই ন্যায়বিচার। আর যা-ই শরীয়তের পরিপন্থী, তাই জুলুম ও অবিচার। আর এ ভিত্তিতে আমরা বলি, কিছু মানুষ যে আইন দিয়ে বিচার করে, যা আল্লাহর শরীয়তের পরিপন্থী, তা ন্যায় নয়; বরং তা জুলুম, অবিচার ও বাতিল। আর যে ব্যক্তি এসব আইন দিয়ে বিচার করল এই বিশ্বাসে যে, তা আল্লাহর বিধানের অনুরূপ অথবা তার চেয়ে উত্তম, তাহলে সে কাফির, আল্লাহর দ্বীন থেকে মুরতাদ। কারণ সে আল্লাহ তাআলার এ বাণীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল, ‘আল্লাহর চেয়ে অধিক উত্তম বিধান কে দিতে পারে দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য?’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৫০) অর্থাৎ আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা আর কেউ নেই। কিন্তু এ কথা সেই বোঝে, যে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। পক্ষান্তরে আল্লাহ যার অন্তর্দৃষ্টিকে অন্ধ করে দিয়েছেন, সে তা বুঝতেও পারে না; বরং তার মন্দ কাজকে তার কাছে সুশোভিত করে দেখানো হয়, ফলে সে তাকে উত্তম মনে করে। আর আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।[6]শারহু রিয়াদিস সালিহীন, পৃষ্ঠা ৬১২
ثم بين هذه الصدقة فقال: (تعدل بين اثنين صدقة) يعني: رجلان يتخاصمان إليك فتعدل بينهما؛ تحكم بينهما بالعدل، وكل ما وافق الشرع فهو عدل، وكل ما خالف الشرع فهو ظلم وجور. وعلى هذا فنقول: هذه القوانين التي يحكم بها بعض الناس وهي مخالفة لشريعة الله ليست عدلاً، بل هي جور وظلم وباطل، ومن حكم بها معتقداً أنها مثل حكم الله أو أحسن منه، فإنه كافر مرتد عن دين الله؛ لأنه كذَّب قول الله تعالى: ﴿ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ ﴾ [المائدة: ٥٠] يعني: لا أحد أحسن من الله حكماً، لكن لا يفهم هذا إلا من يوقن، أما الذي أعمى الله بصيرته، فإنه لا يدري بل قد يزين له سوء عمله فيراه حسناً والعياذ بالله.
شرح رياض الصالحين، ٦١٢
এই উদ্ধৃতিটা একটি মৌলিক সংজ্ঞাগত প্রশ্ন তোলে: ন্যায়বিচার আসলে কী?
শায়েখ এখানে একটি নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন: যা শরীয়তের অনুকূল, তাই আদল বা ন্যায়বিচার। যা শরীয়তের বিরুদ্ধে, তাই জুলুম, এটা যতই “ন্যায্য” বলে দাবি করা হোক না কেন।
আধুনিক আইনী আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়: মানবরচিত আইনও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। শায়েখ এই দাবিকে মূলে কেটে দিচ্ছেন। কারণ “ন্যায়বিচার” একটি নিরপেক্ষ ধারণা নয় বরং এর মানদণ্ড নির্ধারণ করা দরকার। আর মানদণ্ড একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসতে পারে, কারণ তিনিই একমাত্র সর্বজ্ঞ ও আইনের উৎস।
এই উদ্ধৃতিতে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। শায়েখ বলছেন, যে ব্যক্তি মানবরচিত আইনকে আল্লাহর বিধানের সমকক্ষ বা উত্তম মনে করে বিচার করে, সে কাফির কারণ সে সূরা মায়িদার ৫০ নম্বর আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। এই কথাটা প্রথম উদ্ধৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু এখানে যোগ হয়েছে কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কোণটা যা সরাসরি কুফরের একটি স্বীকৃত কারণ।
কুরআনের আয়াত মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা ও মানবরচিত আইনের বিভ্রান্তি
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ
দশম উপকারিতা, আয়াতসমূহ মিথ্যা প্রতিপন্ন করা শাস্তির কারণ। আল্লাহর বাণী, ‘আর যারা আমার নিদর্শনগুলোতে মিথ্যারোপ করে, তাদেরকে আযাব স্পর্শ করবে, কারণ তারা ফিসক করত।’ আর জেনে রাখা চাই যে, আল্লাহর আয়াত দুই প্রকারে বিভক্ত, শরয়ী আয়াত ও কাওনী আয়াত। শরয়ী আয়াত হলো রাসূলগণ আল্লাহর যে শরীয়ত নিয়ে এসেছেন তা। কেননা তুমি যদি এই বিধানসমূহ নিয়ে চিন্তা করো, মুসলিম জাতির জন্যই হোক বা পূর্ববর্তী জাতিসমূহের জন্যই হোক, তাহলে তা সম্পূর্ণরূপে প্রজ্ঞা ও কল্যাণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ দেখতে পাবে এবং দেখবে যে, যদি সমগ্র পৃথিবীর মানুষ একত্রিত হয় এর অনুরূপ কিছু রচনা করতে, তারা কখনও তা পারবে না। আল্লাহ বলেছেন, ‘তবে কি তারা জাহেলী যুগের বিচার চায়? আর দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর চেয়ে অধিক উত্তম বিধান আর কে দিতে পারে?’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৫০)। সুতরাং তুমি কখনও মনে কোরো না যে, ইসলামী শরীয়ত সৃষ্টির যতটা সংশোধন করে, অন্য কোনো বিধিব্যবস্থা বা আইন ততটা করতে পারে।
তাই তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, যারা মানবরচিত আইন দিয়ে বিচার করতে গেছে, যা মানুষ বানিয়েছে। কারণ যে মানুষ তা বানিয়েছে, সে নিঃসন্দেহে ভুলের পাত্র।
আর সে তো পৃথিবীর সকল প্রান্তের সৃষ্টির সমুদয় কল্যাণ সম্পর্কে পরিবেষ্টিত জ্ঞান রাখে না, আর না তাদের স্বার্থ সম্পর্কে?
কেননা আগামী সকল যুগেও বিষয়গুলো পরিবর্তিত হবে। সুতরাং এসব আইনের উপর নির্ভর করা জায়েয নয়। অপরিহার্য হলো আইন গ্রহণ করতে হবে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ থেকে। কারণ আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত, তিনি সৃষ্টির প্রতি সর্বাধিক দয়ালু এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক।[7]তাফসীরুল কুরআন লিল-উছাইমীন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৪১-২৪২
আরবিঃ
الفائدة العاشرة : أن التكذيب بآيات الله سبب للعقوبة لقوله : وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِايَاتِنَا يَمَسُّهُمُ الْعَذَابُ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ ، وليُعلم أن آيات الله – عز وجل – تنقسم إلى قسمين : آيات شرعية وآيات كونية، فالآيات الشرعية ما جاءت به الرسل من شرائع الله؛ لأنك لو تأملت هذه الأحكام سواء في الأمة الإسلامية، أو في الأمم السابقة لوجدتها مطابقة تماماً للحكمة والمصلحة، وأنه لو اجتمع كل أهل الأرض على أن يأتوا بمثل ذلك ما أتوا قال الله – عز وجل -: ﴿أَفَحُكْمَ الْجَهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ ﴾ [المائدة : ٥٠] ، فلا تظن أن أي نظام، أو قانون يُصلح من الخلق ما تصلحه الشريعة الإسلامية.
ولذلك ضل أولئك القوم الذين ذهبوا إلى تحكيم القوانين الوضعية التي وضعها بشر، فهذا البشر الذي وضعها معرض للخطأ بلا شك . كما أنه غير محيط بجميع مصالح الخلق في جميع أقطار الدنيا، ولا بمصالحهم؟
لأن في جميع الأزمان المقبلة؛ لأن الأمور تتغير، إذا فلا يجوز الاعتماد على هذه القوانين، ويجب أن تؤخذ القوانين من كتاب الله وسنة رسول الله – صلى الله عليه وعلى آله وسلم -؛ لأن الله تعالى أعلم بالخلق حالاً ومستقبلاً، ولأنه أرحم بالخلق، ولأنه أحكم الحاكمين .
تفسير القرآن للعثيمين، جز ٦، ص ٢٤١-٢٤٢
শায়েখ এখানে প্রশ্ন তুলছেন: মানুষ কেন সর্বজনীন আইন বানাতে পারে না? কারণ মানুষ তিনটি সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকা।
প্রথমত, মানুষ ভুলের পাত্র, নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কেও সে অজ্ঞ। দ্বিতীয়ত, মানুষ পৃথিবীর সকল প্রান্তের সকল মানুষের সকল প্রয়োজন সম্পর্কে পরিবেষ্টিত জ্ঞান রাখে না। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতের বিষয়গুলো কীভাবে পরিবর্তিত হবে তা মানুষ জানে না।
এই তিনটি সীমাবদ্ধতার বিপরীতে আল্লাহর আইন কেন গ্রহণযোগ্য? কারণ তিনি সর্বাধিক জ্ঞাত, সর্বাধিক দয়ালু এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক। শুধু জ্ঞান থাকলেই হয় না, দয়াও থাকতে হয়, নইলে আইন নিষ্ঠুর হয়। শুধু দয়া থাকলেই হয় না, জ্ঞানও থাকতে হয়, নইলে আইন ভুল হয়। এই দুটোর সমন্বয় একমাত্র আল্লাহর মধ্যেই আছে।
এই উদ্ধৃতিতে শায়েখ আরও একটি কথা বলেছেন যা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। তিনি বলেননি শরীয়তে সব সমস্যার সমাধান সরাসরি লেখা আছে। তিনি বলেছেন, সমাধানের নির্দেশনা আছে যদি কেউ জ্ঞান, অনুধাবন ও গভীর চিন্তার সংমিশ্রণে অনুসন্ধান করে। এটা শরীয়তের প্রতি একটি সক্রিয় দায়িত্বের কথা বলছে, প্যাসিভ অনুসরণের কথা নয়।
তাগুতের বিচার প্রার্থনা ও মুনাফিকির সম্পর্ক
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ
অতঃপর তিনি তাআলা বলেছেন, ‘তুমি কি তাদের দেখনি, যারা দাবি করে যে, তারা ঈমান এনেছে সে বিষয়ের প্রতি যা তোমার প্রতি নাজিল করা হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা নাজিল করা হয়েছিল; অথচ তারা তাগুতের কাছে বিচার চায়, আর তাদের আদেশ তো করা হয়েছিল তাকে অস্বীকার করতে?’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬০) এখানে প্রশ্নবোধক শব্দটি বিস্ময় প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ তুমি কি সেই জাতির ব্যাপারে বিস্মিত হবে না, যারা দাবি করে যে তারা ঈমান এনেছে তোমার প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা নাজিল করা হয়েছে, কিন্তু তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে বিচার চায় না। তারা শুধু তাগুতের কাছে বিচার চায়, আর তাগুত হলো যা-ই আল্লাহর শরীয়তের পরিপন্থী। আর আল্লাহ যেসব শাসক দিয়ে মুসলিমদের পরীক্ষায় ফেলেছেন, তারা এই জাতিরই অন্তর্ভুক্ত। তারা মানুষের মাঝে বিচারকার্যে ফিরে যেতে চায় শরীয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন পথভ্রষ্ট আইনের দিকে, যা অমুক অমুক কাফির ও নাস্তিক রচনা করেছে, যারা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না। আর তারা এমন এক যুগে ছিল, যুগান্তরে তা ভিন্নরকম হতে পারে এবং এমন এক জাতির জন্য প্রণয়ন করেছিল, যা অন্যান্য জাতি থেকে ভিন্ন হতে পারে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কাফিররা যেসব ইসলামী দেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, সে সব দেশের কিছু লোক এই আইনগুলো গ্রহণ করে নিয়েছে।
আর তা ইসলামী জনগণের ওপর প্রয়োগ করতে শুরু করেছে, এতে জনগণের অসন্তোষের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে, এবং তা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহর পরিপন্থী হওয়ার প্রতিও কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে। অথচ তারা দাবি করে যে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে। কীভাবে তা সম্ভব? তারা তো তাগুতের কাছে বিচার চায়, আর তাদের তো আদেশ করা হয়েছিল তাকে অস্বীকার করতে। তাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশ করা হয়েছিল যেন তারা তাগুতকে অস্বীকার করে, তবুও তারা চায় বিচার তাগুতের কাছেই হোক। ‘আর শয়তান তাদের সুদূর পথভ্রষ্টতায় ফেলে দিতে চায়।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬০) শয়তান তাদের আল্লাহর দ্বীন থেকে সুদূর পথভ্রষ্টতায় ফেলে দিতে চায়, নিকটবর্তী কোনো পথভ্রষ্টতায় নয়। কারণ যে আল্লাহর শরীয়তের পরিবর্তে অন্য কিছু দিয়ে বিচার করে, সে নিশ্চয়ই সর্বাধিক ভয়াবহ ও সুদূরতম পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর যখন তাদের বলা হয়, এসো আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে, তুমি মুনাফিকদের দেখবে তারা তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬১) অর্থাৎ যখন তাদের বলা হয়, এসো আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, অর্থাৎ কুরআনের দিকে এবং রাসূলের দিকে, তখন তুমি মুনাফিকদের দেখবে তারা তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এখানে তিনি ‘তাদের দেখবে’ বলেননি, বরং স্পষ্টভাবে ‘মুনাফিকদের’ উল্লেখ করেছেন, যেন তিনি বর্ণনা করলেন যে, এরাই মুনাফিক। সুতরাং তিনি গোপন রাখার স্থলে প্রকাশ করলেন, আর এটি একটি উপকারিতা। আরও একটি কারণ হলো, যেন এর মধ্যে তারাও অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তাদের ছাড়াও অন্যান্য মুনাফিকরাও। কেননা মুনাফিক, আল্লাহর কাছে পানাহ চাই, যখন তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ডাকা হয়, তখন সে বিমুখ হয় এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়।
আয়াতের ধারাবাহিকতায় আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু তখন কী অবস্থা হবে যখন তাদের কৃতকর্মের কারণে কোনো মুসিবত তাদের ওপর আপতিত হয়, তারপর তারা তোমার কাছে আসে আল্লাহর শপথ করে বলে, আমরা তো কেবল মঙ্গল ও সমন্বয় বিধান করতে চেয়েছিলাম।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬২) অর্থাৎ তাদের কী দশা হবে যখন তাদের ওপর কোনো মুসিবত আপতিত হয়, এবং তাদের দোষত্রুটি উন্মোচিত হয় ও প্রকাশ পায়, তারপর তারা তোমার কাছে আসে আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করে বলে, ‘আমরা তো কেবল মঙ্গল ও সমন্বয় বিধান করতে চেয়েছিলাম।’ অর্থাৎ আমরা তো কেবল মঙ্গলসাধন এবং শরীয়ত ও মানবরচিত আইনের মাঝে সমন্বয় বিধান করতে চেয়েছিলাম। অথচ আল্লাহর বিধান ও তাগুতের বিধানের মধ্যে কোনোদিনই কোনো মিল-সমন্বয় হওয়া সম্ভব নয়। তাগুতের বিধান যদি ধরেও নেওয়া হয় যে তা আল্লাহর বিধানের অনুরূপ, তবুও সেক্ষেত্রে তা আল্লাহরই বিধান বলে গণ্য হবে, তাগুতের নয়। আর এ কারণেই মানবরচিত আইনে এমন কোনো উপকারী মাসআলা নেই, যা ইসলামী শরীয়তে আগেই বিদ্যমান নেই।
এ কারণেই আল্লাহ বলেছেন, ‘এরাই তারা, যাদের অন্তরে কী আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তাদের উপদেশ দাও এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে হৃদয়স্পর্শী কথা বল।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৩) অর্থাৎ এরাই তারা, যাদের অন্তরের গোপন কথা আল্লাহ জানেন। যদিও তারা মানুষের সামনে প্রকাশ করে যে, তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং তারা শরয়ী বিধান ও সাংবিধানিক আইনের মাঝে মঙ্গল ও সমন্বয় বিধান করতে চায়। তারাই তারা, যাদের অন্তরের কথা আল্লাহ জানেন এবং তারা তাদের উম্মতের জন্য কী চেয়েছিল তাও তিনি জানেন। ‘সুতরাং তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও’, তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার এই আদেশ তাদের জন্য ধমকস্বরূপ। ‘এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে হৃদয়স্পর্শী কথা বল’, অর্থাৎ তাদের এমন বক্তব্য শুনাও যা তাদের অন্তরে পৌঁছে যায়, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।[8]শারহু রিয়াদিস সালিহীন লিল-উসাইমিন, পৃষ্ঠা ৪০৮-৪০৯
আরবিঃ
ثم قال تعالى : هو أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ ءَامَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يتحاكموا إلى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أَمِرُوا أَن يَكْفُرُوا يه ﴾ [النساء : (١٠) ، الاستفهام هنا للتعجيب – يعني ألا تتعجب من قوم ، يزعمون أنهم آمنوا بما أنزل عليك ، وبما أنزل من قبلك ، ولكنهم لا يريدون التحاكم إلى الله ورسوله ، إنما يريدون أن يتحاكموا إلى الطاغوت ، وهو كل ما خالف شريعة الله . ومن هؤلاء القوم ما ابتلى الله به المسلمين من بعض الحكام الذين يريدون أن يرجعوا في الحكم بين الناس إلى قوانين ضالة بعيدة عن الشريعة ، وضعها فلان وفلان من كفار وملاحدة ، لا يعلمون عن الإسلام شيئًا ، وهم أيضًا في عصر قد تختلف العصور عنه ، وفي أمة قد تختلف عنها الأمم الأخرى .
لكن – مع الأسف – فإن بعض الذين استعمرهم الكفار من البلاد الإسلامية ، أخذوا هذه القوانين ،
وصاروا يطبقونها على الشعب الإسلامي ، غير مبالين امتعاض الشعب منها ، وغير مبالين بمخالفتها لكتاب الله وسنة رسوله ، وهم يزعمون أنهم آمنوا بالله ورسوله ، كيف ذلك ؟ وهم يريدون أن يتحاكموا إلى الطاغوت و قد أمروا أن يكفروا به ، أمروا أمرًا من الله أن يكفروا بالطاغوت ، ومع ذلك يريدون أن يكون التحاكم إلى الطاغوت ، ﴿ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلُّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا ﴾ [النساء : (٦٠) يريد الشيطان أن يضلهم عن دين الله ضلالاً بعيدًا ليس قريبا ؛ لأن من حكم غير شريعة الله قد ضل أعظم الضلال ، وأبعد الضلال .
قال الله لى : ﴿ وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا ﴾ [النساء : (١١) أي إذا قيل لهم : تعالوا إلى ما أنزل الله وهو القرآن ، وإلى الرسول ، وعند ذلك رأيت المنافقين يصدون عنك صدودًا ، ولم يقل : رأيتهم ، لأجل أن يبين أن هؤلاء منافقون . فأظهر في موضع الإضمار ، وهذه فائدة . ولأجل أن يشمل هؤلاء وغيرهم من المنافقين ؛ فإن المنافق -والعياذ بالله – إذا دعي إلى الله ورسوله أعرض وصد .
فكَيْفَ إِذَا أَصَبَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وتوفيقا ﴾ [النساء : (۱۲) . يعني كيف حالهم إذا أصابتهم مصيبة ، وكشفت عوراتهم واطلع عليها ، ثم حاءوك يحلفون بالله وهم كاذبون : إِن أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا ( يعني ما أردنا إلا الإحسان والتوفيق بين الشريعة وبين القوانين الوضعية ، ولا يمكن أن يكون هناك توفيق بين حكم الله وحكم الطاغوت أبدًا ، حكم الطاغوت لو فرض أنه وافق حكم الله لكان حكما لله لا للطاغوت ، ولهذا ليس في القوانين الوضعية من المسائل النافعة ؛ فإنها قد سبق إليها الشرع الإسلامي ؛ ولهذا قال : أُولَيكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغَا ) و النساء : (٦٣) ، يعني هؤلاء هم الذين يعلم الله ما في قلوبهم ، وإن أظهروا للناس أنهم يؤمنون بالله ، وأنهم يريدون الإحسان والتوفيق بين الأحكام الشرعية والأحكام القانونية ، هؤلاء هم الذين يعلم الله ما في قلوبهم ، وماذا أرادوا لأمتهم ، ﴿ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ ) ، وهذا الأمر بالإعراض عنهم تهديدا لهم وَقُل لَّهُمْ في أَنفُسِهِمْ قَوْلاً بَلِيمًا ) أي قل لهم قولاً بليغا يصل إلى أنفسهم ليتعظوا به.
شرح رياض الصالحين للعثيمين، ص ٤٠٨-٤٠٩
এই উদ্ধৃতিটা সূরা নিসার ৬০-৬৩ নম্বর আয়াতের একটি বিস্তারিত তাফসির, কিন্তু শায়েখ এটাকে সরাসরি আধুনিক বাস্তবতার সাথে যুক্ত করেছেন।
শায়েখ এখানে ঐতিহাসিক কারণ চিহ্নিত করেছেন: মুসলিম দেশগুলোয় মানবরচিত আইন কীভাবে এলো? উপনিবেশের মাধ্যমে। কাফিররা এসে তাদের আইন চাপিয়ে দিয়ে গেছে। স্বাধীনতার পরেও সেই আইন রয়ে গেছে কারণ কিছু শাসক সেই ব্যবস্থাকে সুবিধাজনক মনে করেছেন।
এখানে একটি গভীর পর্যবেক্ষণ আছে: এই আইনগুলো কারা বানিয়েছে? শায়েখ বললেন, এমন মানুষ যারা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানত না, ভিন্ন যুগে ও ভিন্ন সমাজে বাস করত। তারপর সেই আইন মুসলিম জনগণের উপর চাপানো হলো। এর মধ্যে একটি বৌদ্ধিক বিরোধাভাস আছে যা শায়েখ সরাসরি তুলে ধরেছেন যে, এই শাসকরা দাবি করছেন তারা ঈমানদার, অথচ তারা অমুসলিমের বানানো আইনকে মুসলিমদের উপর প্রযোজ্য মনে করছেন।
“শরীয়ত ও মানবরচিত আইনের সমন্বয়” করার দাবি সম্পর্কে শায়েখ একটি যৌক্তিক কথা বলেছেন যা সহজেই বোঝা যায়। যদি মানবরচিত আইনের কোনো মাসআলা শরীয়তের সাথে মিলে যায়, তাহলে সেটা শরীয়তেরই মাসআলা — তাগুতের কৃতিত্ব নেই। আর যেখানে মেলে না, সেখানে সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। তাহলে “সমন্বয়ের” দাবিটা আসলে একটি ফাঁকা কথা।
শরীয়তের পরিবর্তে মানবরচিত আইন: সম্পূর্ণ কুফরি
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ
আর এর ভিত্তিতে আমরা বলি, যারা এখন আইন দিয়ে বিচার করে এবং তাদের পেছনে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহকে ছুড়ে ফেলে, তারা কখনোই ঈমানদার নয়। তারা ঈমানদার নয়। কারণ আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের শপথ, তারা ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না তারা তাদের পারস্পরিক বিবাদে তোমাকে বিচারক নিযুক্ত করে।’ আর তাঁর বাণী, ‘আর যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুযায়ী বিচার করে না, তারাই কাফির।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৪৪) আর এই আইন দিয়ে বিচারকারীরা তা কোনো বিশেষ মামলায়, প্রবৃত্তি বা জুলুমের তাড়নায় কিতাব ও সুন্নাহর পরিপন্থী বিচার করছে না, বরং তারা এই আইনের মাধ্যমে দ্বীনকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছে। তারা এই আইনকে আল্লাহর শরীয়তের স্থানে বসিয়েছে। আর এটি কুফরি, যদিও তারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, দান-সদকা করে এবং হজ করে তবুও। তারা যতদিন আল্লাহর বিধান জেনে-শুনে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে এই পরিপন্থী আইনের দিকে ধাবিত হবে, ততদিন তারা কাফির।
‘অতএব তোমার প্রতিপালকের শপথ, তারা ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না তারা তাদের পারস্পরিক বিবাদে তোমাকে বিচারক নিযুক্ত করে, অতঃপর তুমি যে ফয়সালা দেবে তা নিয়ে নিজেদের মনে কোনো দ্বিধা অনুভব করবে না এবং সম্পূর্ণভাবে তা মেনে নেবে।’ সুতরাং তুমি বিস্মিত হবে না যদি আমরা বলি যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর শরীয়তকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো আইন গ্রহণ করল, সে কাফির হয়ে গেল, যদিও সে রোজা রাখে এবং নামাজ পড়ে। কারণ কিতাবের অংশবিশেষের সাথে কুফরি করা পুরো কিতাবের সাথেই কুফরি করার সামিল। শরীয়তকে খণ্ডিত করে মানা যায় না। হয় তুমি তার সবটার ওপর ঈমান আনবে, নয় তো তার পুরোটাকেই অস্বীকার করবে। আর যদি তুমি কিছু অংশে ঈমান আনো এবং কিছু অংশের সাথে কুফরি করো, তাহলে তুমি সবটার সাথেই কুফরি করছ। কেননা তোমার অবস্থা বলে দেয় যে, তুমি কেবল তারই ওপর ঈমান আনো যা তোমার প্রবৃত্তির অনুকূল। আর যা তোমার প্রবৃত্তির পরিপন্থী, তুমি তাতে ঈমান আনো না। এটাই হল কুফরি। এর দ্বারা তুমি প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে এবং আল্লাহকে ছেড়ে তোমার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করলে।
সারকথা, বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ, আজকের মুসলিম শাসকদের জন্য যা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হতে পারে। কেননা তারা এমন আইন প্রণয়ন করেছে যা শরীয়ত পরিপন্থী, অথচ তারা শরীয়তকে চেনে। কিন্তু তারা তা প্রণয়ন করেছে, আল্লাহর কাছে পানাহ চাই, আল্লাহর শত্রু কাফিরদের অনুকরণে, যারা এসব আইন রচনা করেছে এবং মানুষ তার উপর চলছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, এদের জ্ঞানের সল্পতা ও দ্বীনের দুর্বলতার জন্য, তারা জানে যে, এই আইনের রচয়িতা অমুকের ছেলে অমুক কাফির, যে যুগ থেকে শত শত বছর পেরিয়ে গেছে, তদুপরি সে এমন এক স্থানে বাস করত যা ইসলামী জাতির স্থান থেকে ভিন্ন, তারপর সে এমন এক জাতির অংশ ছিল যা ইসলামী জাতি থেকে ভিন্ন। এসব সত্ত্বেও তারা এই আইনগুলো ইসলামী জাতির ওপর চাপিয়ে দেয় এবং ফিরে আসে না। তারা আল্লাহর কিতাবের দিকে ফিরে আসে না, আর না তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর দিকে। তাহলে ইসলাম কোথায়? ঈমান কোথায়? আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত যে তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূল, এর প্রতি সত্যায়নই বা কোথায়? আর তাঁর রিসালাতের ব্যাপকতা যে সর্ববিষয়ে পরিব্যাপ্ত, এর প্রতি সত্যায়নই বা কোথায়?
অনেক অজ্ঞ মানুষ মনে করে যে, শরীয়ত শুধুমাত্র বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার ইবাদতের সাথেই সম্পৃক্ত, অথবা বিয়ে, উত্তরাধিকার ও তৎসদৃশ ব্যক্তিগত জীবন বিষয়ক বিধানের সাথে সম্পৃক্ত। তারা এ ধারণায় ভুল করেছে। বরং শরীয়ত সকল বিষয়ে ব্যাপক। আর যদি তুমি এটি সুস্পষ্টভাবে বুঝতে চাও, তাহলে জিজ্ঞেস করো, আল্লাহর কিতাবের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াত কোনটি? তোমাকে বলা হবে, সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াত হলো ঋণ বিষয়ক আয়াত, ‘হে ঈমানদারগণ, যখন তোমরা একে অপরের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণ লেনদেন করো…’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৮২), যা সম্পূর্ণরূপে লেনদেন সম্পর্কে অবতীর্ণ। তাহলে কীভাবে আমরা বলি যে, ইসলামী শরীয়ত কেবল ইবাদত বা ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এটি অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা। যদি এটি ইচ্ছাকৃত হয়, তাহলে তা পথভ্রষ্টতা ও অহংকার। আর যদি অজ্ঞতাবশত হয়, তাহলে তা ত্রুটি, আর তখন মানুষের উচিত জ্ঞানার্জন করা ও জানা।
মূল কথা হলো, মানুষ তিনটি শর্ত পূর্ণ করা ছাড়া ঈমানদার হতে পারে না। প্রথম শর্ত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিচারক নিযুক্ত করা। দ্বিতীয় শর্ত, নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম যে ফয়সালা দিয়েছেন, তা থেকে নিজের মনে কোনো সংকীর্ণতা বা অস্বস্তি অনুভব না করা। তৃতীয় শর্ত, সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করা এবং পূর্ণাঙ্গভাবে অনুগত হওয়া। সুতরাং এই তিনটি শর্ত পূর্ণ হলে তবেই ব্যক্তি ঈমানদার হবে। আর যদি তা পূর্ণ না হয়, তাহলে হয় সে সম্পূর্ণরূপে ঈমান থেকে বের হয়ে যাবে, নয় তো সে ত্রুটিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হবে। আর আল্লাহই তৌফিকদাতা।[9]শারহু রিয়াদিস সালিহীন লিল-উসাইমিন, পৃষ্ঠা ৪১১-৪১২
وقال أيضا:
وبناء على هذا نقول : إن الذين يحكمون القوانين الآن ، ويتركون وراءهم كتاب الله وسنة رسوله ما هم بمؤمنين ، ليسوا بمؤمنين ، لقول الله تعالى : ﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ) ، ولقوله : ﴿ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ فَأُولَبِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ [المائدة : ٤٤] ، وهؤلاء المحكمون للقوانين لا يحكمونها في قضية معينة خالفوا فيها الكتاب والسنة ، لهوى أو لظلم ، ولكنهم استبدلوا الدين بهذه القوانين ، جعلوا هذا القانون يحل محل شريعة الله ، وهذا كفر حتى لو صلوا وصاموا وتصدقوا وحجوا ؛ فهم كفار ما داموا عدلوا عن حكم الله وهم يعلمون بحكم الله – إلى هذه القوانين المخالفة له . و فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تسليما ) فلا تستغرب إذا قلنا : إن من استبدل شريعة الله بغيرها من القوانين فإنه يكفر ولو صام وصلى ؛ لأن الكفر ببعض الكتاب كفر بالكتاب كله ، فالشرع لا يتبعض ، إما أن تؤمن به جميعا ، وإما أن تكفر به جميعا ، وإذا آمنت ببعض وكفرت ببعض ؛ فأنت كافر بالجميع ؛ لأن حالك تقول : إنك لا تؤمن بما يخالف هواك . وأما ما خالف هواك فلا تؤمن به . هذا هو الكفر . فأنت بذلك اتبعت الهوى ، واتخذت هواك إلها من دون الله.
فالحاصل : أن المسألة خطيرة جدا ، من أخطر ما يكون بالنسبة لحكام المسلمين اليوم ؛ فإنهم قد وضعوا قوانين تخالف الشريعة وهم يعرفون الشريعة ، ولكن وضعوها – والعياذ بالله – تبعا لأعداء الله من الكفرة الذين سنوا هذه القوانين ومشى الناس عليها ، والعجب أنه لقصور علم هؤلاء وضعف دينهم ، أنهم يعلمون أن واضع القانون هو فلان ابن فلان من الكفار ، في عصر قد اختلفت العصور عنه من مئات السنين ، ثم هو في مكان يختلف عن مكان الأمة الإسلامية ، ثم هو في شعب يختلف عن الأمة الإسلامية ، ومع ذلك يفرضون هذه القوانين على الأمة الإسلامية ولا يرجعون ! يرجعون إلى كتاب رہے الله ولا إلى سنة رسول الله ﷺ ، فأين الإسلام؟ وأين الإيمان؟ وأين التصديق برسالة محمد ﷺ وأنه رسول للناس كافة ؟ وأين التصديق بعموم رسالته وأنها عامة في كل شيء ؟ .
كثير من الجهلة يظنون أن الشريعة خاصة بالعبادة التي بينك وبين الله ل فقط ، أو في الأحوال الشخصية من نكاح وميراث وما يشبه ذلك ، وهم أخطؤوا في هذا الظن ، الشريعة عامة في كل شيء، وإذا شئت أن يتبين لك هذا ، فاسأل ما هي أطول آية في كتاب الله ؟ سيقال لك : إن أطول آية هي : آية الدين : ﴿ يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدين … ﴾ [البقرة : (۲۸۲) ، كلها في المعاملات ، فكيف نقول : إن الشرع الإسلامي خاص بالعبادة أو بالأحوال الشخصية . هذا جهل وضلال ، إن كان عن عمد ؛ فهو ضلال واستكبار ، وإن كان عن جهل ؛ فهو قصور ويجب أن يتعلم الإنسان ويعرف
المهم : أن الإنسان لا يمكن أن يؤمن إلا بثلاثة شروط : الأول : تحكيم النبي ﷺ ، والثاني : ألا يجد في صدره حرجا ولا يضيق صدره بما قضى النبي – عليه الصلاة والسلام – ، والثالث : يسلم تسليما، وينقاد انقيادا تاما . فبهذه الشروط الثلاثة يكون مؤمنا ، وإن لم تتم فإما أن يخرج من الإيمان مطلقا وإما أن يكون ناقص الإيمان . والله الموفق
شرح رياض الصالحين للعثيمين، ص ٤١١-٤١٢
এই উদ্ধৃতিটা প্রথম উদ্ধৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ। সেখানে বলা হয়েছিল কোন বিশ্বাসের কারণে কুফর হয়। এখানে বলা হচ্ছে কোন কাজের মাত্রায় কুফর হয়।
মূল পার্থক্যটা এখানে: একটি মামলায় ভুল রায় দেওয়া এক জিনিস, আর পুরো শরীয়তকে বদলে ফেলে মানবরচিত আইনকে তার স্থানে বসানো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। প্রথমটা হয় জুলুম বা ফিসক। দ্বিতীয়টা সর্বদাই কুফর এমনকি হোক সে আইনপ্রণেতা নামাজ পড়ুক, রোজা রাখুক।
শায়েখ এখানে একটি নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন যা অনেকের কাছে কঠিন মনে হয়: কিতাবের অংশবিশেষের সাথে কুফর করা পুরো কিতাবের সাথেই কুফর। কারণ কেউ যদি বলে “শরীয়তের ইবাদতের অংশ মানব, কিন্তু শাসনের অংশ মানব না” — তাহলে সে আসলে বলছে সে শুধু নিজের পছন্দমতো অংশ মানে। এটা ঈমান নয়, প্রবৃত্তির অনুসরণ।
এই উদ্ধৃতিতে শরীয়তকে “শুধু ইবাদত ও ব্যক্তিগত আইনের বিষয়” মনে করার ভ্রান্তিও খণ্ডন করা হয়েছে। শায়েখের যুক্তি সহজ: কুরআনের দীর্ঘতম আয়াত কোনটি? ঋণ বিষয়ক আয়াত যা সম্পূর্ণ মুয়ামালাত ও অর্থনীতির বিষয়। এটাই প্রমাণ যে শরীয়ত ইবাদতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।
গাইরুল্লাহর আইন অনুসরণে শিরক ও তাকফিরের শর্তসমূহ
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ
উত্তর হলো, সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (রাসূল) বলেছেন, যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে শপথ করে সে কুফরি করল অথবা শিরক করল। সুতরাং নবীর নামে শপথ করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
অতএব যদি কোনো ব্যক্তি বলে, কিছু মানুষের মুখে অনিচ্ছাকৃতভাবে এই শপথ বেরিয়ে যায়, যেমন তারা উদ্দেশ্য ছাড়াই বলে ফেলে ‘নবীর কসম’, তাহলে উত্তর হলো, আমরা বলব, যদি তা অনিচ্ছাকৃত হয়, তবুও তার জন্য আবশ্যক হবে সে তার জবানকে তা থেকে পবিত্র করবে এবং নিজেকে এই হারাম শপথে অভ্যস্ত করবে না, যতক্ষণ না সে তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়।
রুবুবিয়াতের শিরকের অন্তর্ভুক্ত হলো, মানুষ এমন কিছু সমকক্ষ গ্রহণ করবে যারা আল্লাহর শরীয়ত পরিপন্থী বিধান প্রবর্তন করে, আর সে তাদের সাথে একমত হবে, অথচ সে জানে যে তা শরীয়তের পরিপন্থী। এ কারণেই ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ কিতাবুত তাওহীদে এ বিষয়ে শিরোনাম দিয়েছেন, ‘বাব: যারা আলেম ও শাসকদের আনুগত্য করল আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল করতে অথবা আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম করতে, তারা তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করল’। সুতরাং যদি এমন কোনো সম্প্রদায় পাওয়া যায়, যারা ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী মানবরচিত আইনের অনুসরণ করে, অথচ তারা জানে যে তা শরীয়তের পরিপন্থী, তাহলে আমরা বলব, এরা মুশরিক সম্প্রদায়। কারণ তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য একজনকে বিচারকরূপে গ্রহণ করল, যে সৃষ্টির মাঝে বিচার করে। আর এটা জানা বিষয় যে, সৃষ্টির মাঝে বিচার করা রুবুবিয়াতেরই দাবিসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করল। এ কারণেই আদি ইবনে হাতিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছিল এবং মারইয়াম-পুত্র মসীহকেও’ সম্পর্কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা তো তাদের ইবাদত করি না। তিনি বললেন, ‘তারা কি আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল করত না, আর তোমরা তা হালাল মনে করতে? আর তারা কি আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম করত না, আর তোমরা তা হারাম মনে করতে?’ তিনি বললেন, হ্যা, ইয়া রাসূলাল্লাহ। তিনি বললেন, ‘এটাই তাদের ইবাদত।’ সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে শিরক বলে গণ্য করলেন। আর এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাসকের অবাধ্যতার মতো পাপ কাজে আনুগত্য করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আল্লাহর নাফরমানির ক্ষেত্রে কোনো সৃষ্টিরই আনুগত্য করতে নিষেধ করেছেন।
অতঃপর তিনি আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম বলেছেন, ‘আনুগত্য কেবল সৎ কাজেই।’ তিনি একবার একটি ছোট বাহিনী প্রেরণ করেন এবং তাদের ওপর একজনকে নেতা নিযুক্ত করেন, আর তাদের বলেন, তোমাদের নেতার আনুগত্য করো। একদিন সেই নেতা তাদের ওপর রাগান্বিত হলেন এবং বললেন, তোমরা আমার জন্য কাঠ জড়ো করো। তখন তারা কাঠ জড়ো করল। তারপর সে বলল, তোমরা তাতে আগুন জ্বালাও। তখন তারা তাতে আগুন জ্বালাল। তারপর সে বলল, তোমরা এর মধ্যে প্রবেশ করো। কাঠ সংগ্রহে তাদের আনুগত্য সঠিক ছিল, আর আগুন জ্বালানোতে তাদের আনুগত্যও সঠিক ছিল। কিন্তু যখন সে বলল, তোমরা এতে প্রবেশ করো, তারা থমকে গেল এবং বলল, আমরা কেমন করে আগুনে প্রবেশ করি? অথচ আমরা তো আগুন থেকে পলায়ন করেই ঈমান এনেছি। তারা বিরত থাকল এবং তাতে প্রবেশ করল না। অতঃপর যখন তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে আসল এবং তাঁকে ঘটনার সংবাদ দিল, তিনি বললেন, ‘যদি তারা তাতে প্রবেশ করত, তাহলে তা থেকে আর বের হতেই পারত না। আনুগত্য কেবল সৎ কাজেই।’
অতএব, আল্লাহর শরীয়ত বিরোধী কাজে বড় নেতাদের অনুসরণ করা রুবুবিয়াতের শিরকের অন্তর্ভুক্ত, কারণ মানুষের মাঝে বিচার করা রুবুবিয়াত ও সার্বভৌম কর্তৃত্বের দাবিসমূহ থেকেই উদ্ভূত।[10]ফাতাওয়া ইবন উসাইমিন, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৮৫-২৮৬
وقال أيضا:
فالجواب : إن أعظم الخلق هو الذي قال من حلف بغير الله فقد كفر أو أشرك (1) فيكون الحلف بالنبي من الشرك .
فإذا قال انسان : إن بعض الناس يجري على لسانهم هذا القسم يقول والنبي بدون قصد فالجواب : أن نقول إذا كان بغير قصد فانه يلزمه أن يطهر لسانه منه، وأن لا يعود نفسه على هذا القسم المحرم حتى يتخلص منه .
من الشرك بالربوبية أن يتخذ الإنسان أندادا يشرعون تشريعات تخالف شرع الله ، فيوافقهم فيها مع علمه بمخالفتها للشريعة، ولهذا ترجم الامام محمد بن عبد الوهاب – رحمه الله – ترجم على ذلك في كتاب التوحيد بقوله : «باب من أطاع العلماء والأمراء في تحليل ما حرم الله أو تحريم ما أحل الله فقد اتخذهم أرباباً فإذا وجد قوم يتبعون القوانين الوضعية المخالفة للشريعة الإسلامية مع علمهم بمخالفتها للشريعة فإننا نقول : هؤلاء قوم مشركون لأنهم اتخذوا حاكما يحكم بين الخلق غير الله – عز وجل – . ومن المعلوم ان الحكم بين الخلق من مقتضيات الربوبية فقد اتخذوهم أربابا من دون الله ولهذا يروى من حديث عدي بن حاتم رضي الله عنه أنه قال للرسول ﷺ في قوله تعالى : اتخذوا أحبارهم ورهبانهم أربابا من دون الله والمسيح ابن مريم قال يا رسول الله إنا لسنا نعبدهم قال : «اليس يحلون ما حرم الله فتحلونه ويحرمون ما أحل الله فتحرمونه قال : نعم يا رسول الله قال : فتلك عبادتهم (۲) فجعل النبي ﷺ هذا من الشرك ولهذا منع النبي صلى الله عليه وسلم من طاعة ولي الأمر في معصية الله منع من أن يطاع أحد من الخلق في معصية الله . فقال عليه الصلاة والسلام «إنما الطاعة في المعروف». فقد أرسل سرية وأمر عليهم رجلا وقال لهم أطيعوا أميركم فغضب عليهم الأمير ذات يوم وقال اجمعوا لي حطبا فجمعوا حطبا ثم قال أوقدوها النار فأوقودها النار ثم قال ادخلوا فيها. طاعتهم في جمع الحطب صحيحة، وطاعتهم في إضرام النار صحيحة . لكن لما قال ادخلوها توقفوا وقالوا كيف ندخل في النار ونحن لم نؤمن إلا فراراً من النار فامتنعوا ولم يدخلوها فلما رجعوا إلى رسول الله ﷺ وأخبروه الخبر قال : «انهم لو دخلوا فيها ما خرجوا منها، إنما الطاعة في المعروف (۱) .
إذا متابعة الكبراء في مخالفة شريعة الله من الشرك بالربوبية لأن الحكم بين الناس من مقتضيات الربوبية والسلطان .
فتاوى ابن عثيمين، جز ٧، ص ٢٨٥-٢٨٦
এই উদ্ধৃতিটা তৃতীয় উদ্ধৃতির ব্যবহারিক প্রয়োগ।
তৃতীয় উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছিল: শরীয়তবিরোধী আইনে বিশ্বাসের স্তরে সম্মতি দেওয়া রুবুবিয়্যাতের শিরক। এই উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে: এমন নেতার আনুগত্য করা যে আল্লাহর শরীয়ত বিরুদ্ধ আইনে চলে, সেটাও রুবুবিয়্যাতের শিরকের মধ্যে পড়ে।
কিতাবুত তাওহীদের বাবটির উল্লেখ এখানে তাৎপর্যপূর্ণ: “যারা আলেম ও শাসকদের আনুগত্য করল আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল করতে বা যা হালাল করেছেন তা হারাম করতে, তারা তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করল।” শায়েখ এই নীতিটাকে আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইনে প্রয়োগ করছেন।
আগুনের ঘটনার হাদীসটা এখানে খুব কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কাঠ জড়ো করতে আনুগত্য সঠিক, আগুন জ্বালাতে সঠিক, কিন্তু আগুনে প্রবেশ করতে নয়। সাহাবীরা থামলেন কারণ এটা আল্লাহর শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করছিল। এই ঘটনা একটি নীতি প্রতিষ্ঠা করে: আনুগত্য শর্তহীন নয়, শরীয়তের সীমার মধ্যেই বৈধ।
তাকফিরের শর্ত ও প্রতিবন্ধকতা: একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
তাকফিরের ক্ষেত্রে ইকামাতুল হুজ্জাহ এর শর্তসমূহ
প্রশ্ন
বর্তমানে একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক উঠেছে, যা সাধারণ আইন প্রণয়নের সাথে সম্পৃক্ত, যে আইন দিয়ে শাসকরা বিচার করে থাকেন। এ মতাবলম্বীরা আপনার ফতোয়া, আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন, ‘আল মাজমুউস সামীন’ গ্রন্থ থেকে দলিল দেন যে, এটি সুস্পষ্ট কুফরি, কারণ তা আল্লাহর শরীয়তকে পরিবর্তন করে ফেলা। অনুরূপভাবে এটি শাইখ মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম রহিমাহুল্লাহর প্রতিও সম্বন্ধযুক্ত করা হয়।
এখানে প্রশ্ন হলো, তাকফিরের প্রতিবন্ধকতাগুলো অথবা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত যে শর্তগুলো প্রমাণ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারণ করেছেন, তা কি ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানের পরিবর্তে সাধারণ আইন প্রণয়ন করে বিচার করে?
উত্তর
প্রত্যেক ব্যক্তি যে কুফরিমূলক কাজ করে, তার মধ্যে তাকফিরের প্রতিবন্ধকতা না থাকা আবশ্যক। এ কারণেই সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যখন সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কি শাসকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করব? তিনি বললেন, ‘না, যতক্ষণ না তোমরা সুস্পষ্ট কুফরি দেখতে পাও, যে বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে।’ সুতরাং তা হতে হবে সুস্পষ্ট কুফরি, যা সর্বজনবিদিত এবং যার কোনো ব্যাখ্যার অবকাশ নেই। আর যদি তাতে ব্যাখ্যার অবকাশ থাকে, তাহলে তার কর্তা কাফির বলে গণ্য হবে না, যদিও আমরা বলি যে, এ কাজটি কুফরি।
সুতরাং পার্থক্য করতে হবে বক্তব্য ও বক্তার মধ্যে, এবং কাজ ও কর্মকারীর মধ্যে। কোনো কাজ হয়তো ফাসেকী, কিন্তু কর্মকারী ফাসিক নয়, কারণ তার ফাসিক আখ্যায়িত করার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। আবার কোনো কাজ কুফরিও হতে পারে, কিন্তু কর্মকারী কাফির নয়, কারণ তার কাফির আখ্যায়িত করার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। আর খারেজিদের বিদ্রোহের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর যে ক্ষতি হয়েছে, তা শুধুমাত্র এই ব্যাখ্যার কারণেই হয়েছে। খারেজিরা তো আলী ইবনে আবী তালিবের সাথে শামবাসীদের সেনাদলের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু যখন আলী ইবনে আবী তালিব ও শামবাসীদের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হলো, তখন যে খারেজিরা তাঁর সাথে ছিল তারা তাঁর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করল, এমনকি তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন এবং তাদের হত্যা করলেন, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে এ কথাই যথেষ্ট যে, তারা বলেছিল, ‘তুমি মানুষকে বিচারক মেনে নিয়েছ, তাই তুমি আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার বিপরীত বিচার করেছ।’ আর এ কারণেই তারা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।
ভ্রান্ত ব্যাখ্যা হলো উম্মতের বিপদ। কেননা কোনো বিষয় কুফরি নয়, অথচ মানুষ তা স্পষ্ট কুফরি বলে বিশ্বাস করে নেয় এবং এর ফলে সে দ্বীন থেকে বের হয়ে যায়। আবার কোনো বিষয় কুফরি হতে পারে, কিন্তু কর্মকারী কাফির নয়, কারণ তার কুফরি রোধ করার মতো কোনো প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। অথচ এই বিদ্রোহী মনে করে যে তার কোনো ওজর নেই, ফলে সে বের হয়ে যায়।
এ কারণেই মানুষের উচিত লোকদের কাফির অথবা ফাসিক সাব্যস্ত করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া থেকে সাবধান থাকা। হতে পারে কেউ এমন কাজ করল যা সন্দেহাতীতভাবে ফিসক, কিন্তু সে তা জানে না। অতঃপর তুমি বললে, ‘হে ভাই! এটি হারাম’। তখন সে বলল, ‘আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন’ এবং তা থেকে বিরত থাকল। অতএব, আমি কীভাবে কোনো মানুষের বিরুদ্ধে ফাসিক বলে রায় দিতে পারি, অথচ তার বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি? আপনি যেসব আরব ও মুসলিম শাসকদের প্রতি ইঙ্গিত করছেন, তারা হয়তো ওজরগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তাদের কাছে প্রমাণ সুস্পষ্ট হয়নি, অথবা প্রমাণ তাদের কাছে পেশ করা হয়েছিল, কিন্তু এমন কেউ এসেছে যে তাদের কাছে বিষয়টি সন্দেহপূর্ণ ও ধোঁয়াশাপূর্ণ করে দিয়েছে।
সুতরাং এ বিষয়ে ধীরস্থিরতা আবশ্যক। তদুপরি যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, আমরা সুস্পষ্ট কুফরি দেখতে পেলাম, যে বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে, আর ‘দেখতে পাওয়া’ শব্দটি একটি শর্ত, ‘কুফরি’ একটি শর্ত, ‘সুস্পষ্ট’ একটি শর্ত এবং ‘এ বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে’ এগুলো মিলিয়ে মোট চারটি শর্ত।
আমরা বলি, ‘তোমরা দেখতে পাও’ অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে জানতে পার, যা দ্বারা মিথ্যা গুজব থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, যার কোনো বাস্তবতা নেই।
আর ‘কুফরি’ শব্দটি ফিসক থেকে সতর্কতার জন্য। অর্থাৎ শাসক যদি ফাসিক ও পাপিষ্ঠ হয়, কিন্তু কুফরির স্তরে না পৌঁছে, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা জায়েয নয়।
তৃতীয় শর্ত, ‘সুস্পষ্ট’ অর্থাৎ পরিষ্কার, যা কোনো ব্যাখ্যা গ্রহণ করে না। আরও বলা হয়েছে, সুস্পষ্ট অর্থ প্রকাশ্য।
আর চতুর্থ শর্ত, ‘এ বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে’ অর্থাৎ তা শুধু আমাদের নিজেদের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট নয়, বরং আমরা একটি সুস্পষ্ট ও অকাট্য দলিলের উপর নির্ভরশীল।
এই চারটি শর্ত বিদ্রোহ বৈধ হওয়ার জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু আমাদের কাছে পঞ্চম একটি শর্ত রয়েছে বিদ্রোহ ওয়াজিব হওয়ার জন্য। তা হলো, যদি আমাদের জন্য বিদ্রোহ করা বৈধ হয়, তাহলে কি শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা আমাদের ওপর ওয়াজিব হবে? আমাদের কি বিদ্রোহ করা ওয়াজিব? এ ক্ষেত্রে কল্যাণের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। যদি আমরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হই, তাহলে তখন আমরা বিদ্রোহ করব। আর যদি আমরা সক্ষম না হই, তাহলে বিদ্রোহ করব না। কারণ শরীয়তের সকল ওয়াজিব কাজই সক্ষমতা ও সামর্থ্যের শর্তাধীন।
অধিকন্তু, যদি আমরা বিদ্রোহ করি, তাহলে আমাদের এই বিদ্রোহের ফলে তার চেয়েও বড় ও ভয়াবহ কোনো বিপর্যয় ঘটতে পারে, যা এই ব্যক্তি তার বর্তমান অবস্থায় থাকার কারণে ঘটত না। কারণ আমরা বিদ্রোহ করলাম, অথচ তার ক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হলো, আমরা আরও বেশী লাঞ্ছিত হলাম এবং সে তার সীমালঙ্ঘন ও কুফরিতে আরও বাড়াবাড়ি করল। সুতরাং এসব বিষয়ে বিচক্ষণতা প্রয়োজন, আর শরীয়তের সাথে জ্ঞানবুদ্ধির সংযোগ ঘটানো আবশ্যক এবং এসব ব্যাপারে আবেগকে দূরে রাখতে হবে। আমরা আবেগের মুখাপেক্ষী আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনার জন্য, আর আমরা জ্ঞানবুদ্ধি ও শরীয়তেরও মুখাপেক্ষী, যাতে আমরা আবেগের পেছনে ছুটে না যাই, যা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।[11]‘লিকাউল বাবিল মাফতুহ’ (৫১/২০, মাক্তাবা শামেলা ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী
«شروط إقامة الحجة في التكفير
السؤال
هناك قضية تثار الآن حول ما يناط للتشريع العام فيما يحكم به الحكام، ويستدل أصحاب هذا الرأي بفتواكم حفظكم الله في المجموع الثمين بأن هذا الكفر وأنه واضح؛ لأنه تبديل لشرع الله، كذلك ينسب هذا إلى الشيخ محمد بن إبراهيم رحمه الله.
فالسؤال هنا: هل ترد موانع التكفير أو ما اشترطه أهل السنة والجماعة في إقامة الحجة على من حكم بغير ما أنزل الله تشريعاً عاماً؟
الجواب
كل إنسان فعل مكفراً فلا بد ألا يوجد فيه مانع التكفير، ولهذا جاء في الحديث الصحيح لما سألوه هل ننابذ الحكام؟ قال: (إلا أن تروا كفراً بواحاً عندكم فيه من الله برهان) فلا بد من الكفر الصريح المعروف الذي لا يحتمل التأويل، فإن كان يحتمل التأويل فإنه لا يكفر صاحبه وإن قلنا إنه كفر.
فيفرق بين القول والقائل، وبين الفعل والفاعل، قد تكون الفعلة فسقاً ولا يفسق الفاعل لوجود مانع يمنع من تفسيقه، وقد تكون كفراً ولا يكفر الفاعل لوجود ما يمنع من تكفيره، وما ضر الأمة الإسلامية في خروج الخوارج إلا هذا التأويل، فـ الخوارج كانوا مع علي بن أبي طالب على جيش أهل الشام، فلما حصلت المصالحة بين علي بن أبي طالب وأهل الشام خرجت الخوارج الذين كانوا معه عليه حتى قاتلهم وقتلهم والحمد لله، لكن الشاهد أنهم قالوا: حكمت بغير ما أنزل الله؛ لأنك حكمت البشر، فخرجوا عليه.
فالتأويل الفاسد هو بلاء الأمة؛ فقد يكون الشيء غير كفرٍ فيعتقدها هذا الإنسان أنه كفر بواح فيخرج، وقد يكون الشيء كفراً لكن الفاعل ليس بكافر لوجود مانع يمنع من تكفيره، فيعتقد هذا الخارج أنه لا عذر له فيخرج.
ولهذا يجب على الإنسان التحرز من التسرع في تكفير الناس أو تفسيق الناس، ربما يفعل الإنسان فعلاً فسقاً لا إشكال فيه، لكنه لا يدري، فإذا قلت: يا أخي! هذا حرام.
قال: جزاك الله خيراً.
وانتهى عنه.
إذاً: كيف أحكم على إنسان بأنه فاسق دون أن تقوم عليه الحجة؟ فهؤلاء الذي تشير إليهم من حكام العرب والمسلمين قد يكونون معذورين لم تتبين لهم الحجة، أو بينت لهم وجاءهم من يلبس عليهم ويشبه عليهم.
فلا بد من التأني في الأمر، ثم على فرض أننا رأينا كفراً بواحاً عندنا فيه من الله برهان، وكلمة (رأينا) شرط، و (كفراً) شرط، و (بواحاً) شرط، و (عندنا فيه من الله برهان) شرط أربعة شروط.
فنقول: (أن تروا) أي: تعلموا يقيناً احترازاً من الشائعات التي لا حقيقة لها.
وكلمة (كفراً) احترازاً من الفسق، يعني: لو كان الحاكم فاسقاً فاجراً لكن لم يصل إلى حد الكفر فإنه لا يجوز الخروج عليه.
الثالث: (بواحاً) أي: صريحاً لا يتحمل التأويل، وقيل البواح: المعلن.
والرابع: (عندكم فيه من الله برهان) يعني: ليس صريحاً في أنفسنا فقط، بل نحن مستندون على دليل واضح قاطع.
هذه الشروط الأربعة شرط لجواز الخروج، لكن يبقى عندنا شرط خامس لوجوب الخروج وهو: هل يجب علينا إذا جاز لنا أن نخرج على الحاكم؟ هل يجب علينا أن نخرج؟ ينظر للمصلحة، إن كنا قادرين على إزالته فحينئذٍ نخرج، وإذا كنا غير قادرين فلا نخرج، لأن جميع الواجبات الشرعية مشروطة بالقدرة والاستطاعة.
ثم إذا خرجنا فقد يترتب على خروجنا مفسدة أكبر وأعظم مما لو بقي هذا الرجل على ما هو عليه، لأننا خرجنا ثم ظهرت العزة له، صرنا أذلة أكثر، وتمادى في طغيانه وكفره أكثر، فهذه المسائل تحتاج إلى تعقل، وأن يقترن الشرع بالعقل، وأن تبعد العاطفة في هذه الأمور، فنحن محتاجون للعاطفة لأجل تحمسنا، ومحتاجون للعقل والشرع حتى لا ننساق وراء العاطفة التي تؤدي إلى الهلاك.»
«لقاء الباب المفتوح» (51/ 20 بترقيم الشاملة آليا)
এটি পুরো সংকলনের সবচেয়ে জটিল ও সূক্ষ্ম উদ্ধৃতি। এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিকও।
প্রশ্নটা ছিল: যদি মানবরচিত আইনে বিচার করা সুস্পষ্ট কুফর হয়, তাহলে কি আইন প্রণেতা বা বিচারককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাফির বলা যাবে?
শায়েখের উত্তর একটি মৌলিক আহলুস সুন্নাহর নীতির উপর দাঁড়িয়ে: কাজকে কুফরি বলা এবং কর্মকারীকে কাফির বলা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কাজের হুকুম নির্ধারণ সহজ, কারণ কাজটা দেখা যায়। কিন্তু ব্যক্তির হুকুম নির্ধারণ করতে হলে তার জ্ঞান, নিয়্যত ও প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় নিতে হয়।
শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চারটি শর্ত এই উদ্ধৃতির একটি আলাদা মাত্রা যোগ করে। শুধু কাজটা কুফরি হলেই বিদ্রোহ বৈধ নয়। এর সাথে আরও তিনটি শর্ত: নিশ্চিতভাবে জানা, ব্যাখ্যার কোনো অবকাশ না থাকা, শরয়ী দলিলভিত্তিক হওয়া। এবং পঞ্চমত বিদ্রোহে সক্ষমতা ও বৃহত্তর মাফসাদার অনুপস্থিতি।
খারেজিদের উদাহরণটা ঐতিহাসিক সতর্কতা হিসেবে রাখা হয়েছে। তারা হযরত আলীর একটি ইজতিহাদি সিদ্ধান্তকে “গাইরুল্লাহর বিধানে বিচার” বলে চিহ্নিত করে বিদ্রোহ করেছিল। এটা ছিল তাদের ভুল তাবীল। এই একই ভুল পুনরাবৃত্তি হয় যখন কেউ তাড়াহুড়ো করে শাসককে কাফির বলে বিদ্রোহের পথ ধরে অথচ প্রতিবন্ধকতার মূল্যায়ন করেনি।
শায়েখ এখানে একটি ভারসাম্যের কথা বলেছেন যা পুরো সংকলনের উপসংহার বললেও ভুল হবে না: আবেগ উৎসাহের জন্য দরকার, কিন্তু কাজ করতে হবে শরীয়ত ও বিবেকের সমন্বয়ে। আবেগ একা থাকলে ধ্বংস ডেকে আনে।
উপসংহার
এই দীর্ঘ আলোচনার সারকথা দুটি স্তরে বিভক্ত:
কাজের স্তরে: আল্লাহর বিধান ছাড়া বিচার করা তিনটি অবস্থায় কুফর (জায়েয মনে করা, সমতুল্য মনে করা, শ্রেষ্ঠ মনে করা), একটি অবস্থায় জুলুম (শত্রুতার কারণে), একটি অবস্থায় ফিসক (প্রবৃত্তি বা স্বার্থের কারণে)। আর শরীয়তকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে মানবরচিত আইন শরীয়তের স্থানে বসানো সর্বদা কুফর।
ব্যক্তির স্তরে: কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফির বলতে হলে তাকফিরের শর্ত পূর্ণ এবং প্রতিবন্ধকতা অনুপস্থিত হতে হবে। জ্ঞান না থাকলে, ওজর থাকলে বা ধোঁকায় পড়লে তাকফির হবে না — যদিও কাজটি কুফরির।
এই দুই স্তরের পার্থক্যই হলো শায়েখের পুরো বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি।
অনুবাদ ও লেখাঃ সাফিন চৌধুরী
References
| ↑1 | মাজমু ফাতাওয়া ইবনে উছাইমিন, খণ্ড ৯-১০, পৃষ্ঠা ৭৪০-৭৪৫ |
|---|---|
| ↑2 | হিদায়াতুল কুরআন, ১৮৩ |
| ↑3 | শারহুল মুমতি’ আলা যাদিল মুস্তাকনি’, ১৪/৪০৯ |
| ↑4 | শারহুল মুমতি’ আলা যাদিল মুস্তাকনি’, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ১১২-১১৪ |
| ↑5 | মাজমু ফাতাওয়া ইবন উসাইমিন, খণ্ড ২৫, পৃষ্ঠা ৫৪৭ |
| ↑6 | শারহু রিয়াদিস সালিহীন, পৃষ্ঠা ৬১২ |
| ↑7 | তাফসীরুল কুরআন লিল-উছাইমীন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৪১-২৪২ |
| ↑8 | শারহু রিয়াদিস সালিহীন লিল-উসাইমিন, পৃষ্ঠা ৪০৮-৪০৯ |
| ↑9 | শারহু রিয়াদিস সালিহীন লিল-উসাইমিন, পৃষ্ঠা ৪১১-৪১২ |
| ↑10 | ফাতাওয়া ইবন উসাইমিন, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৮৫-২৮৬ |
| ↑11 | ‘লিকাউল বাবিল মাফতুহ’ (৫১/২০, মাক্তাবা শামেলা ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী |

