১২৮৪ হিজরি তথা ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দের আগে কোথাও ৮ রাকাত তারাবী পড়া হয়নি?
আরিফ বিন হাবিব সাহেব দাবি করেছেন যে, ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দের আগে নাকি কোথাও তারাবি ৮ রাকাত পড়া হতো না।
[presto_player id=1242]
তার এই দাবির বিপক্ষে দেওবন্দের বই থেকে দলিল দিচ্ছি:
রাশিদ আহমেদ গাঙ্গুহির জবাব: যারা আট রাকাত পড়ছে তারা ফযিলতপূর্ণ সুন্নাত ত্যাগকারী। আল্লাহ ভালো জানেন। [1]ফাতাওয়ায়ে রাশিদীয়া, পৃষ্ঠা ৩৯২

দেওবন্দের হুজ্জাতুল ইসলাম উপাধিতে পরিচিত কাসিম নানাতূবী (১৮৩২-১৮৮০ খ্রি:) কে তার ছাত্র সৈয়দ আহমদ হাসান আমরুহী ১২৮৮ হিজরি তথা ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে একটি চিঠি লিখে পাঠান। চিঠি লেখার কারণ ছিল তৎকালীন সময় আট রাকাত তারাবী পড়া প্রচলিত ছিল এবং বিশ রাকাত তারাবীকে অনেকে বিদআত বলছিল। তাই ছাত্রের সেই চিঠির জবাবে কাসিম নানাতূবী তারাবীহ নিয়ে বই লিখেছেন। তার বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন:
১২৮৮ হিজরি নববি সালে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলা আ’লিহি আফদালুস সালাতু ওয়াস সালাম) আমার প্রিয় গুণগ্রাহী, সৈয়দ বংশের সন্তান মৌলভী সৈয়দ আহমদ হাসান আমরুহী, যিনি আমার সাথে সনদের দিক থেকে সম্পৃক্ত , তিনি আমাকে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। এ চিঠির মূল উদ্দেশ্য ছিল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মধ্যে প্রচলিত বিশ রাকাত তারাবিহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা যে, এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা নাকি মুস্তাহাব। এ প্রশ্নের পেছনে কারণ হলো, বর্তমান সময়ে চারদিকে এমন হৈচৈ ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে যে, বিশ রাকাতের মাসনূনিয়াত (সুন্নত হিসেবে স্বীকৃতি) প্রমাণিত নয়। এমনকি নববি সুন্নতের অনুসরণে আগ্রহী অনেকেই বিতর ব্যতীত বারো রাকাতের পরিবর্তে আট রাকাত আদায় করতে শুরু করেছেন। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিশ রাকাতকে বিদআত বলার পর্যায়েও পৌঁছে গেছে। কেউ কেউ সরাসরি এ কথা প্রকাশ্যে বলে দিচ্ছেন, আবার কেউবা ইশারা-ইঙ্গিত ও গোপনীয়তার সহিত লুকিয়ে লুকিয়ে এ মত প্রকাশ করছেন।[2]আনওয়ারুত তারাউয়ী ফী তাওদীহি মিসবাহিত তারাউয়ী, পৃষ্ঠা নং ৩০
بڑھ گئی۔ بعضوں نے صاف صاف کہ دیا اور بعضوں نے چھپے ہوئے راز کے طور پر اشارے اور کنایہ کے پردے میں چھپا لیا ۔

আশরাফ আলী থানভী এর নিকট দিল্লি থেকে একজন এসে জিজ্ঞাসা করেন তারাবী আট নাকি বিশ রাকাত, থানভী এটাও উল্লেখ্য করেছেন যে উক্ত প্রশ্নকারী নিজেকে হাদিসের অনুসারী তথা আহলে হাদিস বলে দাবি করতো:
تحفہ رمضان فضائل ومَسائل , صفحہ نمبر 99

উপমহাদেশে প্রখ্যাত আহলে হাদিস বিদ্বান শাইখুল কুল ফিল কুল সাইয়্যেদ মিয়া নাযির হুসাইন মুহাদ্দিস দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ) এর সময়েই আহলে হাদিসগণ নিয়মিত আট রাকার তারাবীহ পড়ে আসছিলেন। যার প্রমাণ হিসেবে তার বই থেকে একটা ফতোয়া উল্লেখ্য করে দিচ্ছি, যেখানে একজন লোক তাকে প্রশ্ন করেছে তৎকালীন সময়ে প্রচলিত আট রাকাত তারাবী প্রসঙ্গে:
দ্বীনের উলামাগণ এই মাসআলায় কী মত রাখেন যে – তারাবী নামাযে রাকাত সংখ্যা রাসূল ﷺ এবং খুলাফায়ে রাশেদীন এর আমল অনুযায়ী কত রাকাত বলে প্রমাণিত আর আমাদের সময়ে কিছু মানুষ আট রাকাত পড়ার উপর সন্তুষ্ট আর কিছু মানুষ বিশ রাকাতের আমলকে অধিক সওয়াব মনে করছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ও তাঁর খুলাফায়ে রাশেদীনের (রা.) আমল ও বক্তব্য কী ছিল— তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করুন।[4]ফতোয়ায়ে নাযির্যিয়াহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৩৪

আহলে হাদিসদের মসজিদে হানাফি লোকেরাও ইমামের পিছনে নামায পড়ে। হানাফিরা আহলে হাদিস ইমামের পিছনে আট রাকাত তারাবীহ আদায় করে বাকি ১২ রাকাত নিজেদের মাযহাব অনুযায়ী ঐ মসজিদে নিজেরা জামাতের সহিত পড়ে। আহলে হাদিসগণ কি তাদের মানা করতে পারবে? [5]ফাতাওয়ায়ে সানাউল্লাহ আমৃতসরী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৮৬
এই প্রশ্নকারীর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে তৎকালীন যুগে তথা ১৮৬৭ সনের পূর্বেই আট রাকাত তারাবী ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত ছিল। কারণ আহলে হাদিস মসজিদে হানাফিগণ আহলে হাদিসদের পেছনে জামাতে ৮ রাকাত আদায় করে বাকি ১২ রাকাত নিজেরা আদায় করতো।
ফাতিহে কাদিয়ান সানাউল্লাহ আমৃতসরী (রাহিমাহুল্লাহ) ১৮৬৮ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তার ফতোয়ার কিতাবে প্রশ্নকারীর মতে তখনই আহলে হাদিসদের আলাদা মসজিদ এবং তাতে ৮ রাকাত তারাবী প্রচলন ছিল। যার মানে দাঁড়ায় ১৮৬৭ সনের পূর্ব থেকেই আহলে হাদিসগণ ভারতীয় উপমহাদেশে আট রাকাত তারাবী পড়ছেন।
এছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশ এবং খালিজ এ ভিন্নধর্মী বিভিন্ন দর্শনাথী এসেছে ইংরেজ আমলে। যাদের বইতেও আট রাকাত তারাবী আদায়ের প্রমাণ পাওয়া যায়।
যেমন জন লেউইস তার বই Travels In Arabia তে লিখেছেন:


The Kaaba is opened only three times in the year: on the 20th of the month of Ramadhan, on the 15th of Zulkade, and on the 10th of Moharram (or Ashour, as the Arabs call it). The opening takes place one hour after sun-rise, when the steps are wheeled up to the gate of the building: as soon as they touch the wall, immense crowds rush upon them, and in a moment fill the whole interior of the Kaaba. The steps are lined by the eunuchs of the mosque, who endeavour in vain to keep order, and whose sticks fall heavy upon those who do not drop a fee into their hands; many of the crowd, however, are often unmercifully crushed. In the interior every visitor is to pray eight rikats, or make sixteen prostrations; [6]Travels in arabia by john Lewis, Page No 324
সুতরাং এটা একটা ভুয়া দাবি যে ১২৮৪ হিজরির আগে পৃথিবীর কোথাও আট রাকাত পড়া হয়নি। আরিফ বিন হাবিব সাহেবকে এই মিথ্যাচার থেকে ফিরে আসার আহবান করবো। আল্লাহু মুস্তাআন।
References


