রদ্দ ও খণ্ডন

রাষ্ট্রপ্রধান মানবরচিত বিধান দিয়ে ফায়সালা করলে কি সে মুমিনদের আমীর বলে গণ্য হবে?

আবু বকর জাকারিয়ার ভ্রান্ত বক্তব্যের জবাব

রাষ্ট্রপ্রধান মানবরচিত বিধান দিয়ে ফায়সালা করলে সেই শাসক কি আমিরুল মুমিনীন হতে পারে — এই প্রশ্নে সম্প্রতি শাইখ আবু বকর জাকারিয়ার একটি বক্তব্য আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, মানবরচিত বিধান দিয়ে শাসনকারী শাসক “আমির” নয়, কেবল “রাষ্ট্রপ্রধান”। নিচে কুরআন, সুন্নাহ, ফিকহের কিতাব ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো।

Table of Contents

জাকারিয়ার বক্তব্য: ফাসিক শাসক “আমির” নয়, “রাষ্ট্রপ্রধান”

শাইখুল জাহালাহ ওয়াল হিযবিয়্যাহ আবু বকর জাকারিয়া বলেছে:

“যদি রাষ্ট্রপ্রধান মানববচিত বিধান দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাহলে কি সে মুসলিমদের আমির হইতে পারে? তার জবাব: না, সে আমির হইতে পারবো না। তবে আমীর না হইলেও যেগুলি বৈধ বিধান, এগুলিকে আপনি ইগনোর করতে পারবেন না। যেমন ধরেন, টাকা তো আপনার লাগবেই, আপনি বলছে না, যেহেতু সে ইসলাম দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে না, আমি টাকাও নিব না, তো কেমনে চলবেন আপনি? আপনাদের একটা গুষ্টি আছে, হুয়া কুয়া বলে, ওদের পরিবার থাকে ওখানে। জামাতে মুসলিমের নাম দিসে, ওরা টাকাও ব্যবহার করে না, সরকারি চাকরিও নিবে না, পড়বেও না। মূর্খ থাকতে চায়, এগুলো তো শরীয়ত বলে নাই। আপনি কি করবেন? আপনি বুঝানোর চেষ্টা করে মানুষকে দাওয়াত দিন। দেশেও, আল্লাহর বিধান যেগুলো অন্যায়, এগুলো আমরা মানবো না, কিন্তু শরীয়ত বিধান মানতে হবে। কিন্তু তারা আমীর না, কারণ তারা রাষ্ট্রপ্রধান। আল্লাহর বিধানকে তারা মানে নাই। এই জন্য যারা মানে নাই তারা আমীর না, তারা রাষ্ট্রপ্রধান। কথা কি বুঝাইতে পারছি?”

play-sharp-fill

আল্লাহর বিধান দিয়ে ফায়সালা না করা শাসক: কাফির না ফাসিক?

ইবনে তাইমিয়ার তিনটি স্তর: ইস্তিহলাল, ফিসক ও কুফরের পার্থক্য

ইবনে তাইমিয়া তাঁর ‘মিনহাজুস সুন্নাহ আন নববীয়া’ কিতাবে বলেছেন:

তিনি বলেছেন: {আর যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুসারে বিচার-ফায়সালা করে না, তারাই কাফির} [সূরা আল-মায়িদা: ৪৪]।
নিঃসন্দেহে যে ব্যক্তি আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি যা নাজিল করেছেন তদনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করা অপরিহার্য বলে বিশ্বাস করে না, সে কাফির। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুসরণ না করে নিজস্ব দৃষ্টিতে যেটা ন্যায়বিচার মনে হয় তা দিয়ে মানুষের মাঝে বিচার-ফায়সালা করাকে বৈধ মনে করে, সেও কাফির। কারণ এমন কোনো উম্মত নেই যা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে ফায়সালা করার নির্দেশ দেয় না, আর তাদের ধর্মে ন্যায়বিচার কখনো কখনো সেটাই হতে পারে যা তাদের নেতৃস্থানীয়রা সাব্যস্ত করে। বরং ইসলামের দাবিদার অনেকেই এমনসব প্রথা ও রেওয়াজ দিয়ে বিচার-ফায়সালা করে যেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নাজিল করেননি, যেমন মরুবাসীদের প্রাচীন রীতিনীতি এবং তাদের প্রভাবশালী নেতাদের নির্দেশ। তারা মনে করে যে, কুরআন ও সুন্নাহকে বাদ দিয়ে এগুলো দিয়েই বিচার-ফায়সালা করা উচিত।
আর এটাই কুফর। কেননা বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে, তবুও তারা শুধু সেইসব চালু প্রথা অনুযায়ীই বিচার-ফায়সালা করে যা তাদের প্রভাবশালীরা নির্দেশ দেয়। কাজেই তারা যখন জানে যে, আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান ব্যতীত অন্য কিছু দিয়ে বিচার-ফায়সালা করা জায়েয নয়, কিন্তু তারা তা মানতে বাধ্য হয় না, বরং আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানের বিপরীত বিচার-ফায়সালা করাকে বৈধ মনে করে, তখন তারা কাফির। অন্যথায় তারা অজ্ঞ, যেমন পূর্বে এদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে।
আর আল্লাহ সমস্ত মুসলমানকে নির্দেশ দিয়েছেন, তারা কোনো বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলে তা যেন আল্লাহর দিকে প্রত্যর্পণ করে।[1]«মিনহাজুস সুন্নাহ আন নববীয়া» ৫/১৩০

وقال: {‌ومن ‌لم ‌يحكم بما أنزل الله فأولئك هم الكافرون} [سورة المائدة 44] .
ولا ريب أن من لم يعتقد وجوب الحكم بما أنزل الله على رسوله (2) فهو كافر، فمن استحل أن ‌يحكم بين الناس بما يراه هو عدلا من غير اتباع لما أنزل (3) الله فهو كافر ; فإنه ما من أمة إلا وهي تأمر بالحكم بالعدل، وقد يكون العدل في دينها ما رآه أكابرهم، بل كثير من المنتسبين إلى الإسلام يحكمون بعاداتهم التي لم ينزلها الله سبحانه وتعالى، كسوالف البادية، وكأوامر المطاعين فيهم (4) ، ويرون أن هذا هو الذي ينبغي الحكم به دون الكتاب والسنة.
وهذا هو الكفر، فإن كثيرا من الناس أسلموا، ولكن مع هذا لا يحكمون إلا بالعادات الجارية لهم التي يأمر بها المطاعون، فهؤلاء إذا عرفوا أنه لا يجوز الحكم إلا بما أنزل الله فلم يلتزموا ذلك، بل استحلوا أن يحكموا بخلاف ما أنزل الله فهم كفار، وإلا كانوا جهالا، كمن تقدم أمرهم (5) .
وقد أمر الله المسلمين كلهم إذا تنازعوا في شيء أن يردوه إلى الله
«منهاج السنة النبوية» 5/ 130

শায়েখ আবুল আব্বাস তাকিউদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ এখানে তিনটি স্তর দেখিয়েছেন:

প্রথম স্তর: যে শরীয়াহ মেনে চলার ওয়াজিব হওয়াকেই বিশ্বাস করে না — এটা কুফর আকবর।
মূল শব্দ: “من لم يعتقد وجوب الحكم”।

দ্বিতীয় স্তর: যে শরীয়াহ বাদ দিয়ে অন্য বিধান দিয়ে বিচার করাকে ইস্তিহলাল করে (বৈধ মনে করে) — এটাও কুফর আকবর। মূল শব্দ: “استحلوا أن يحكموا بخلاف ما أنزل الله فهم كفار”।

তৃতীয় স্তর: যে জানে যে শরীয়াহই হক, ইস্তিহলাল নেই, কিন্তু তবুও লঙ্ঘন করছে — এটা কুফর আসগর/ফিসক।
মূল শব্দ: “وإلا كانوا جهالا”।

পার্থক্য হিসেবে তিনি বলেছেন:

“وإلا كانوا جهالا” — “নতুবা তারা জাহিল/অজ্ঞ।”

ইবনু তাইমিয়া এখানে স্পষ্ট করেছেনঃ ইস্তিহলাল থাকলে কাফির, না থাকলে জাহিল/ফাসিক। “জাহিল” মানে এখানে পাপী অজ্ঞ, কাফির নয়।
সুতরাং ইস্তিহলাল ও ফিসকের পার্থক্য:
ইস্তিহলালকারী অন্তরে মনে করে “এই বিচার জায়েয বা উচিত।” এটা কুফর আকবর কারণ সে আল্লাহর হুকুমকে প্রযোজ্য মনে করছে না।
ফাসিক অন্তরে জানে “আল্লাহর হুকুমই হক, আমি গুনাহ করছি।” কিন্তু প্রবৃত্তি, লোভ, ভয়, দুর্বলতার কারণে লঙ্ঘন করছে। এটা কুফর আসগর। যা তাকে জালিম ও ফাসিক বানাবে।
এটাই ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর “كفر دون كفر”-এর প্রকৃত ব্যাখ্যা যা ইবনু তাইমিয়ার কলমে এসেছে।

জাকারিয়ার দাবির রদ্দ: আলিমদের সরাসরি বক্তব্য

জাকারিয়া বলেছেন যে মানবরচিত বিধান দিয়ে শাসনকারী শাসক “আমীর” নয়, তবে “রাষ্ট্রপ্রধান” হিসেবে তার বৈধ আদেশ মানতে হবে। সে নিজেই স্বীকার করেছে যে সেই শাসক কাফির নয়, কারণ কাফির হলে তাকে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান বলে বৈধ আদেশও মানার কথা বলত না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান দিয়ে ফায়সালা করে না সে হয় কাফির, নাহলে মুসলিম কিন্তু ফাসিক ও জালিম। আর সে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান বলে মূলত ফাসিক শাসকের কথা বলছে। তার দাবি দাঁড়াচ্ছে, ফাসিক শাসক “আমীরুল মুমিনীন” হতে পারে না। এই দাবি আলিমদের সুস্পষ্ট বক্তব্য ও ইসলামের ইতিহাস উভয় দ্বারাই খণ্ডন করছি:

ইমাম নববীর বক্তব্য: ফাসিক হলেও আমিরুল মুমিনীন

ইমাম আন নববী রহিমাহুল্লাহ তাঁর ‘রাউদাতুত তালিবিন ওয়া উমদাতুল মুফতিন’ কিতাবে বলেছেন:

তৃতীয়: ইমামের জন্য ‘খলিফা’, ‘ইমাম’ ও ‘আমিরুল মুমিনিন’ বলা বৈধ। মাওয়ারদি বলেছেন, তাঁর জন্য ‘খলিফাতু রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলাও বৈধ। শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থে বাগাভি বলেছেন: শাসক ফাসিক হলেও তাকে ‘আমিরুল মুমিনিন’ বলা হবে। আমি বিষয়টি এবং এর সাথে সম্পর্কিত আলোচনা ‘আল আযকার’ গ্রন্থের শেষাংশে বিস্তারিত ব্যক্ত করেছি। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।[2]‘রাউদাতুত তালিবিন ওয়া উমদাতুল মুফতিন’ ১০/৪৯

الثالثة: ‌يجوز ‌أن ‌يقال ‌للإمام: الخليفة والإمام وأمير المؤمنين، قال الماوردي: ويقال أيضا: خليفة رسول الله صلى الله عليه وسلم، قال البغوي في شرح السنة: ويقال له أمير المؤمنين وإن كان فاسقا، وقد أوضحت ذلك وما يتعلق به في أواخر كتاب الأذكار. والله أعلم.

লক্ষ্য করুন: ইমাম নববী এখানে ইমাম বাগাভির বক্তব্য উদ্ধৃত করে স্পষ্ট করেছেন, “ويقال له أمير المؤمنين وإن كان فاسقا” অর্থাৎ শাসক ফাসিক হলেও তাকে “আমিরুল মুমিনীন” বলা হবে। “وإن كان فاسقا” শব্দটি লক্ষ্য করুন, “যদিও সে ফাসিক হয়”। এখানে কোনো শর্ত নেই যে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে। যে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে না তার কুফর যদি মিল্লাত থেকে খারিজের পর্যায়ে না হয় তাহলে সে মুসলিম থাকবে কিন্তু ফাসিক ও জালিম বলে গণ্য হবে। উপরে ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ ফাসিক বলে এরূপ শাসককেই বুঝাচ্ছেন। জাকারিয়ার দাবি এই একটি বাক্যেই খণ্ডিত হয়ে গেলো।

ইমাম বাগাভির বক্তব্য: শারহুস সুন্নাহ থেকে দলিল

ইমাম আল বাগাভি তাঁর ‘শারহুস সুন্নাহ’ কিতাবে বলেছেন: হুমাইদ ইবনে জানজুওয়াইহা বলেছেন: তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে খিলাফত সত্য, খিলাফত কেবল তাদের জন্যই যারা নিজেদের আমলের মাধ্যমে এই নামের সত্যতা প্রমাণ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে তাঁর সুন্নত আঁকড়ে ধরেছেন। আর তারা যখন সুন্নতের বিরোধিতা করে ও জীবনাচার পরিবর্তন করে ফেলে, তখন তারা বাদশাহ, যদিও তাদের নাম খলিফা হয়। তবে মুসলমানদের বিষয়াবলির তত্ত্বাবধায়ককে ‘আমিরুল মুমিনিন’ ও ‘খলিফা’ বলাতে কোনো অসুবিধা নেই, যদিও সে ন্যায়পরায়ণ ইমামদের জীবনাচারের কিছু বিষয়ের পরিপন্থী হয়, কারণ সে মুমিনদের কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত এবং মুমিনরা তার কথা শোনে। তাকে ‘খলিফা’ও বলা হয়, কারণ সে পূর্ববর্তী জনের স্থলাভিষিক্ত হয় ও তার স্থানে দাঁড়ায়। তবে আদম ও দাউদ আলাইহিমাস সালামের পরে আর কাউকে ‘খলিফাতুল্লাহ’ বলা হয় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে খলিফা নিযুক্ত করতে যাচ্ছি [আল বাকারা: ৩০]। আরও বলেন: হে দাউদ, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছি [সোয়াদ: ২৬]।[3]‘শারহুস সুন্নাহ’ বাগাভি ১৪/৭৫

قال حميد بن زنجويه: يريد أن الخلافة حق، الخلافة إنما هي للذين صدقوا هذا الاسم بأعمالهم، وتمسكوا بسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم من بعده، فإذا خالفوا السنة، وبدلوا السيرة، فهم حينئذ ملوك، وإن كانت أساميهم الخلفاء، ‌ولا ‌بأس ‌أن ‌يسمى ‌القائم ‌بأمور ‌المسلمين: أمير المؤمنين والخلفاء، وإن كان مخالفا لبعض سير أئمة العدل لقيامه بأمر المؤمنين وسمع المؤمنين له، ويسمى خليفة، لأنه خلف الماضي قبله، وقام مقامه، ولا يسمى أحد خليفة الله بعد آدم وداود عليهما السلام، قال الله سبحانه وتعالى: {إني جاعل في الأرض خليفة} [البقرة: 30]، وقال: {يا داود إنا جعلناك خليفة في الأرض} [ص: 26].

লক্ষ্য করুন: “সুন্নত বিরোধীরা বাদশাহ, যদিও তাদের নাম খলিফা”। কিন্তু এর পরের অংশে যান, হুমাইদ ইবন যানজুওয়াইহ নিজেই এরপর বলেছেন, “ولا بأس أن يسمى القائم بأمور المسلمين: أمير المؤمنين والخلفاء، وإن كان مخالفا لبعض سير أئمة العدل” অর্থাৎ মুসলমানদের বিষয়াবলির তত্ত্বাবধায়ককে “আমিরুল মুমিনীন” ও “খলিফা” বলাতে কোনো অসুবিধা নেই, যদিও সে ন্যায়পরায়ণ ইমামদের জীবনাচারের বিরোধী হয়। ন্যায়পরায়ণ ইমামদের জীবনাচারের বিরোধী তথা আল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা না করা ফাসিক শাসক, তাকেও তিনি আমীর বলেছেন। “বাদশাহ” বলাটা ছিল নৈতিক মূল্যায়ন, শরঈ উপাধি বাতিলের ঘোষণা নয়।

আমিরের ফিকহী সংজ্ঞা: কর্তৃত্বই মানদণ্ড, ধার্মিকতা নয়

মুহাম্মদ আমিমুল ইহসান আল মুজাদ্দিদি আল বারকাতি তাঁর ‘আত তা’রীফাতুল ফিকহিয়্যা’ কিতাবে বলেছেন:

আমির: যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। আমিরুল মুমিনিন: আমাদের নেতা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং তাঁর পরবর্তী খলিফাগণের উপাধি।[4]‘আত তা’রীফাতুল ফিকহিয়্যা’ পৃ. ৩৬

‌‌الأمير: من تولى أمر قوم. ‌‌‌أمير ‌المؤمنين: ‌لقب سيدنا عمر رضي الله عنه ومن بعده من الخلفاء.

তার মতে আমিরের সংজ্ঞা হলো “من تولى أمر قوم” অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। শর্ত হলো কর্তৃত্ব গ্রহণ করা, আল্লাহর বিধান সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা নয়, কারণ এই শর্ত ধরলে খুলাফায়ে রাশেদীন এর পর কোনো মুসলিম শাসক অবশিষ্ট থাকবে না যারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রতিটা ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করেছে। যে শাসক বাস্তবে মুসলমানদের কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত, সে এই সংজ্ঞা অনুযায়ী আমির।

আমিরুল মুমিনীন উপাধি: আলিমদের ইজমার সাক্ষ্য

মাউসু’আতুল ইজমা: খলিফা, ইমাম ও আমিরুল মুমিনীন সমার্থক

একদল গবেষক কর্তৃক প্রণীত ‘মাউসু’আতুল ইজমা”তে বলা হয়েছে:

চতুর্থ অনুসন্ধান: ইমাম, খলিফা ও আমিরুল মুমিনিন শব্দগুলোর মধ্যে সমার্থকতা। খিলাফত ও ইমামত অধ্যায়ে বর্ণিত নববী হাদীস ও সাহাবা ও তাবিঈনের উদ্ধৃত আসারসমূহের পর্যালোচনায় আমরা ‘খলিফা’ ও ‘ইমাম’ পদের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাই না। আর দ্বিতীয় খলিফাতুর রাশিদীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনভার গ্রহণের পর এর সাথে ‘আমিরুল মুমিনিন’ শব্দটিও সংযোজিত হয়। আলিমগণ এই মত গ্রহণ করেছেন যে, এই তিনটি শব্দই একে অপরের সমার্থক এবং এদের এই সমার্থকতা একই সত্তার প্রতি ইঙ্গিত ও প্রয়োগের ভিত্তিতে। আর অর্থগত দিক থেকে প্রতিটি শব্দেরই নিজস্ব স্বতন্ত্র অর্থ রয়েছে। যেমন কুরআন, ফুরকান, হুদা ও নুর এরা কুরআনের প্রতি ইঙ্গিতের দিক থেকে সমার্থক, কিন্তু অর্থগত দিক থেকে ভিন্নার্থবোধক।[5]‘মাউসু’আতুল ইজমা’ – আল ফাদিলা ৫/৫১

‌‌المطلب الرابع: الترادف بين ألفاظ: الإمام والخليفة وأمير المؤمنين: باستعراض الأحاديث النبوية والآثار المروية عن الصحابة والتابعين الواردة في باب الخلافة والإمامة، لا نجد فيها تفريقا بين لفظ “الخليفة”، ولفظ “الإمام”، وبعد تولية ثاني الخلفاء الراشدين عمر بن الخطاب رضي الله عنه أضيف إليها لفظ: “أمير المؤمنين”. وقد ذهب العلماء إلى أن هذه الألفاظ الثلاثة مترادفة، وأن هذا الترادف من قبيل دلالتها وإطلاقها على ذات واحدة، أما من حيث معانيها فلكل واحدة منها معناها الخاص بها، مثل القرآن، والفرقان، والهدى، والنور، فهي مترادفة من حيث دلالتها على القرآن، ومتباينة من حيث معانيها.

অর্থাৎ আলিমগণের ইজমা হলো ইমাম, খলিফা ও আমিরুল মুমিনীন তিনটি শব্দ একই সত্তার জন্য প্রযোজ্য। জাকারিয়া “আমীর” ও “রাষ্ট্রপ্রধান” বলে যে চতুর্থ একটি শ্রেণি তৈরি করেছেন, সেটা শরিয়তের পরিভাষায় সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।

মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিতাবের বক্তব্য

মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস কমিটি প্রণীত ‘আস সিয়াসাতুশ শারইয়্যা’য় বলা হয়েছে:

আর তা তো ইমামত-বিষয়ক আলোচনার মাধ্যমেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। অথচ খিলাফত, আমিরাতে মুমিনীন ও ইমামত এ সবই একই অর্থ বহন করে, তা হলো ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব।[6]‘আস সিয়াসাতুশ শারইয়্যা, জামিআতুল মদিনা’ পৃ. ৪৬৪

وإنما اشتهرت بمباحث الإمامة، ومع أن الخلافة، وإمارة المؤمنتين، والإمامة، كلها تشير إلى معنى واحد هو رياسة الدولة الإسلامية،

মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বক্তব্যও নিশ্চিত করছে যে খিলাফত, আমিরাতে মুমিনীন ও ইমামত সবই একই অর্থ বহন করে। এদের মধ্যে জাকারিয়া যে বিভাজন তৈরি করেছেন সেটা শরিয়তের দৃষ্টিতে অচেনা।

শায়খ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদের বক্তব্য

শায়েখ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ হাফিযাহুল্লাহ তাঁর ‘শারহুল আরবাঈন আন নববীয়া’ তে বলেছেন:

অতঃপর যখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুবরণ করলেন এবং তাঁর পরে উমর আসলেন, তখন তিনি ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধিতে ভূষিত হলেন। তা এজন্য যে, যাতে পদবাচ্যের ধারাবাহিকতা অতিরিক্ত দীর্ঘ না হয়ে যায়। কেননা তখন বলা হতো, আবু বকর হলেন রাসূলুল্লাহর খলিফা; উমর হলেন রাসূলুল্লাহর খলিফার খলিফা; উসমান হলেন রাসূলুল্লাহর খলিফার খলিফার খলিফা; আলী হলেন রাসূলুল্লাহর খলিফার খলিফার খলিফার খলিফা। আর তাঁদের পরে যত ব্যক্তি আসবেন, প্রত্যেকের সাথেই একটি করে শব্দ জুড়তে থাকবে, তাতে ধারাবাহিকতা বেড়েই চলবে। তাই তাঁরা সেটার পরিবর্তে ‘আমিরুল মুমিনিন’ শব্দটি গ্রহণ করলেন, যা মুমিনদের কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত প্রত্যেকের জন্যই প্রযোজ্য হবে।[7]‘শারহুল আরবাঈন আন নববীয়া, আল আব্বাদ’ ১/৫

فلما توفي أبو بكر رضي الله عنه وجاء بعده عمر صار يلقب بأمير المؤمنين، وذلك حتى لا تكثر الإضافات فـ أبو بكر خليفة رسول الله، وعمر خليفة خليفة رسول الله، وعثمان خليفة خليفة خليفة رسول الله، وعلي خليفة خليفة خليفة خليفة رسول الله، وكل من جاء بعدهم سيضاف إليه لفظ، فتكثر الإضافات، فاستبدلوا ذلك بكلمة (‌أمير ‌المؤمنين) التي تطلق على كل من يتولى إمرة المؤمنين.

এই উদ্ধৃতির দিকে লক্ষ্য করুন: শায়খ আব্বাদ বলেছেন “التي تطلق على كل من يتولى إمرة المؤمنين” অর্থাৎ এই উপাধি প্রযোজ্য হবে এমন প্রত্যেকের জন্য যে মুমিনদের কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত। শর্ত হলো কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকা, ফাসিক না হওয়া নয়।

এবার আসি ইতিহাসের দলিলে। কারণ তাত্ত্বিক বক্তব্যের পাশাপাশি ইতিহাসও প্রমাণ করে যে ফাসিক শাসককে আলিমরা “আমিরুল মুমিনীন” বলেই উল্লেখ করেছেন।

ইতিহাসের সাক্ষ্য: ফাসিক শাসকও আমিরুল মুমিনীন ছিলেন

ওয়ালিদ ইবন ইয়াজিদ: চরম ফিসক সত্ত্বেও উপাধি বহাল

ইবনে শাকির আল কুতুবি তাঁর ‘ফাওয়াতুল ওয়াফিয়াত’ কিতাবে ওয়ালিদ ইবনে ইয়াযিদ এর জীবনিতে বলেছেন:

আল ওয়ালিদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ইবনুল হাকাম, আমিরুল মুমিনিন। তাঁর উপাধি ছিল আল বাইতার, খালি’উ বনি মারওয়ান, আল ফাতিক ও আয যিন্দিক। এবং তিনি ছিলেন সুদর্শন, স্থূলদেহ, শ্বেতবর্ণের সাথে লালিমামিশ্রিত, মধ্যমাকৃতির এবং বার্ধক্যে উপনীত হওয়ায় তাঁর চুলে পাক ধরেছিল। তিনি নব্বই হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং পঁচিশ হিজরিতে যখন তিনি রুসাফায় অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর হাতে বাই’আত হয়। তিনি বুখরা নামক স্থানে তাদমুর থেকে কিছু মাইল দূরে, ছাব্বিশ ও একশত হিজরির জুমাদাল উখরা মাসের আটাশ তারিখে নিহত হন। তখন তাঁর বয়স চল্লিশ, মতান্তরে একচল্লিশ বছর। তাঁর শাসনকাল ছিল এক বছর দুই মাস। তাঁর পিতা হিশামের পর তাঁকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন এবং তিনি তাঁর দুই পুত্র উসমান ও হাকামকে যুগ্মভাবে যুবরাজ নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা বন্দি ছিলেন এবং মারওয়ান আল জা’দি ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত বন্দিই ছিলেন, পরে তিনি তাঁদের হত্যা করেন। ওয়ালিদ আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ লঙ্ঘন করেছিলেন। ফলে লোকেরা তাঁকে পাথর ছুঁড়তে থাকে। তিনি প্রাসাদে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন। তারা তা অবরোধ করে বলে, আমরা আপনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনো ক্ষতির কারণে ক্ষুব্ধ নই; বরং আমরা ক্ষুব্ধ আপনার আল্লাহর হারামকৃত বিষয় লঙ্ঘন, মদ্যপান, আপনার পিতার উম্মে ওয়ালাদদের সঙ্গে সহবাস এবং আল্লাহর বিধানকে হেয় প্রতিপন্ন করার কারণে। তিনি বললেন, তোদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, তোরা অনেক বলে ফেলেছিস। এরপর তিনি প্রাসাদের ভেতর ঢুকে কুরআন হাতে নিয়ে বললেন, আজকের দিন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর দিনের মতো, এবং কুরআন খুলে তিলাওয়াত করতে লাগলেন। তখন তারা দেওয়াল টপকে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আব্দুস সালাম আল লাখমি তাঁর মাথায় আঘাত করে এবং অপর একজন তাঁর মুখমণ্ডলে আঘাত করে, তাতে তিনি নিহত হন। তারা তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে তাঁর মাথা কেটে ফেলে। ইয়াজিদ আন নাকিসের কাছে মাথা আনা হলে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। পূর্বেই তিনি মাথা নিয়ে আসা ব্যক্তির জন্য এক লক্ষ দিরহাম পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। জুমার নামাজের পর মাথাটি বর্শার ডগায় স্থাপন করা হয়। তাঁর ভাই সুলাইমান তা দেখে বলেন, তার জন্য ধ্বংসই নির্ধারিত, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে সে ছিল মদ্যপায়ী, লম্পট, ফাসিক; এবং সে আমার সঙ্গেও তার কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। শায়খ শামসুদ্দিন বলেন, তাঁর থেকে কুফর সাব্যস্ত হয়নি; কিন্তু সে মদ্যপান ও সমকামিতায় লিপ্ত ছিল, আর তাই তারা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। ‘আল ইশ’আরু বিমা লিল মুলুকি মিনান নাওয়াদিরি ওয়াল আশ’আর’ গ্রন্থের রচয়িতা বলেন: কখনো কখনো তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাত আদায় করতেন। হিশামের আমলে তিনি দিন গুনছিলেন কখন খিলাফত পাবেন। একদিন তিনি কুরআন খুললে ‘ওয়াসতাফতিহু ওয়া খাবা কুল্লু জাব্বারিন আনিদ’ (সূরা ইবরাহিম: ১৫) বেরিয়ে আসে, তখন তিনি কুরআনখানিকে তিরের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে সেই আয়াতের দিকে তির ছুঁড়তে থাকেন।[8]‘ফাওয়াতুল ওয়াফিয়াত’ ৪/২৫৬-২৫৭

الوليد بن يزيد الوليد بن يزيد بن عبد الملك بن مروان بن الحكم ‌أمير ‌المؤمنين، ‌لقب البيطار وخليع بني مروان والفاتك والزنديق. وكان وسيما جسيما أبيض مشربا بحمرة، ربعة قد وخطه الشيب. ولد سنة تسعين وبويع له سنة خمس وعشرين هو مقيم بالرصافة، وقتل بالبخراء (2) على أميال من تدمر ثامن وعشرين جمادى الآخرة (3) سنة ست وعشرين ومائة وله أربعون سنة وقيل إحدى وأربعون، وكانت أيامه سنة وشهرين. وكان أبوه عهد إليه بعد هشام. وكان قد جعل ولديه عثمان والحكم وليي عهده فحبسا ولم يزالا في الحبس إلى أن ولي مروان الجعدي فقتلهما. وكان الوليد قد انتهك محارم الله تعالى، فرماه الناس بالحجارة، فدخل القصر وأغلقه، فأحاطوا به وقالوا لم ننقم عليك في أنفسنا شيئا لكن ننقم عليك انتهاك ما حرم الله تعالى، وشرب الخمر ونكاح أمهات أولاد أبيك واستخفافك بأمر الله تعالى، فقال: حسبكم قد أكثرتم، ودخل الدار وأخذ المصحف وقال: يوم كيوم عثمان، وفتح المصحف يقرأ، فتسوروا عليه، وضربه عبد السلام اللخمي على رأسه، وضربه آخر على وجهه فتلف، وجروه وحزوا رأسه وأتي يزيد الناقص بالرأس فسجد، وكان قد جعل لمن يأتيه بالرأس مائة ألف درهم، فنصبه على رمح بعد صلاة الجمعة، فلما رآه أخوه سليمان قال: بعدا له، أشهد أنه كان شروبا للخمر ماجنا فاسقا ولقد راودني عن نفسي. قال الشيخ شمس الدين: ولم يصح عنه كفر، لكنه اشتغل بالخمر واللياطة، فخرجوا عليه لذلك. قال صاحب ” الإشعار بما للملوك من النوادر والأشعار “: كان ربما صلى سكرانا. وكان في أيام هشام ينتظر الخلافة يوما فيوما، ففتح يوما المصحف فطلع ” واستفتحوا وخاب كل جبار عنيد ” ” إبراهيم: 15 ” فجعل المصحف هدفا للسهام وجعل يرمي نحو تلك الآية ويقول

«فوات الوفيات» 4/ 256-257

এই বর্ণনায় দুটি বিষয় একসাথে আছে। এক, ইবন শাকির তাকে “আমিরুল মুমিনীন” বলেছেন। দুই, ইমাম শামসুদ্দিন স্পষ্টভাবে বলেছেন “ولم يصح عنه كفر” অর্থাৎ তার থেকে কুফর সাব্যস্ত হয়নি। অর্থাৎ সে ফাসিক শাসক ছিল এবং ফাসিক হওয়া সত্ত্বেও তার “আমিরুল মুমিনীন” উপাধি বহাল ছিল। মদ্যপান, সমকামিতা, নেশায় নামাজ, কুরআনে তীর ছোড়া, এত কিছুর পরেও উপাধি বাতিল হয়নি। তাকে আমীরুল মুমিনীন বলে প্রজারা ডেকেছে।

ওয়ালিদের নিজস্ব দাবি ও আলিমদের সাক্ষ্য

ইবনে শাকির আল কুতুবি তাঁর ‘ফাওয়াতুল ওয়াফিয়াত’ কিতাবে একই ওয়ালিদ ইবন ইয়াজিদ সম্পর্কে আরও বলেছেন:

তিনি আরও বললেন: আল্লাহর কসম, তিনি আমার খাদ্য থেকে আমাকে বঞ্চিত করছেন। যখন তাঁর কাছে খবর পৌঁছল যে মানুষ নামায ও রোযা ত্যাগ করার জন্য তাঁর সমালোচনা করছে, তিনি বললেন: আমরা যে অবস্থায় আছি তার সমালোচনা করার লোকদের কী অধিকার আছে? আমাদের প্রতি তাদের কর্তব্য দোয়া ও আনুগত্য, আর তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য ন্যায়বিচার ও অনুগ্রহ। তারপর তিনি বললেন: আমি সেই ব্যক্তির প্রতি বিস্মিত, যে জানে যে আনন্দ বুদ্ধির ঘাটতি ছাড়া আসে না, অথচ সে এই পেয়ালাগুলোকে সোপানে পরিণত করে না। তিনি হারাম কাজগুলো হালাল করে নিয়েছিলেন, ফলে তাঁর রক্তও হালাল তথা বৈধ হয়ে গেল।[9]‘ফাওয়াতুল ওয়াফিয়াত’ ৪/২৫৮-২৫৭

وقل لله يمنعني طعامي ولما بلغه أن الناس يعيبون عليه ترك الصلاة والصيام، قال: ما للناس وعيب ما نحن فيه؟ لنا منهم الدعاء والطاعة ولهم منا العدل والإحسان؛ ثم قال: عجبت لمن يعلم أن الفرح لا يكون إلا بنقصان العقل ولا يجعل درجا هذه الأقداح، وأباح المحارم فأصبح دمه وهو مباح. ومن شعره

«فوات الوفيات» 4/ 258-257

ওয়ালিদ নামাজ ও রোজা ছেড়েছেন, হারাম কাজ করেছেন, তবু নিজেই বলছেন “لنا منهم الدعاء والطاعة” অর্থাৎ আমাদের প্রতি তাদের কর্তব্য দোয়া ও আনুগত্য। এবং মুসলিম আলিমরাও এই অবস্থায় তাকে “আমিরুল মুমিনীন” বলেই উল্লেখ করেছেন।

খলিফা মাহদি ও ক্বাযী শারিকের ঘটনা

ইবনে কাসির তাঁর ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ কিতাবে বলেছেন:

এ বছরের মহররম মাসে আমিরুল মুমিনিন মাহদি ইবনুল মানসুর আল আব্বাসি রহিমাহুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন, এক স্থানে যার নাম মাছবাযান। জ্বরের কারণে, মতান্তরে বিষ প্রয়োগে এবং মতান্তরে ঘোড়ার আঘাতে তিনি মারা যান। যেমন বিশদ বিবরণ পরে আসবে। আর এই তাঁর জীবনী:[10]‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ১৩/৫৪০

في المحرم منها توفي أمير المؤمنين المهدي ابن المنصور العباسي رحمه الله بمكان يقال له: ماسبذان. بالحمى، وقيل: مسموما. وقيل: بعضة فرس، فمات. كما سيأتي بيانه. وهذه ترجمته:

«البداية والنهاية» 13/ 540

শাসক মাহদিকে এখানে “আমিরুল মুমিনীন” বলা হয়েছে। এবার দেখো এই একই মাহদির সম্পর্কে পরের বর্ণনায় কী আছে।

ইবনে কাসির তাঁর ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ কিতাবে বলেছেন:

তাঁর কাছে শারীক ইবনে আব্দুল্লাহ আল কাযী সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় যে, শারীক তাঁর পেছনে নামায পড়াকে বৈধ মনে করেন না। তখন তিনি শারীককে উপস্থিত করালেন এবং তাঁর সাথে কথা বললেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে মাহদী তাঁকে বললেন: হে ব্যভিচারিণীর সন্তান। শারীক বললেন: আস্তে, আস্তে, হে আমিরুল মুমিনিন! তিনি তো ছিলেন অধিক রোযা পালনকারিনী ও রাত জেগে ইবাদতকারিনী। তখন তিনি তাঁকে বললেন: হে ধর্মদ্রোহী, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। শারীক হেসে ফেললেন এবং বললেন: হে আমিরুল মুমিনিন, ধর্মদ্রোহীদের কিছু চিহ্ন আছে যার দ্বারা তাদের চেনা যায়; তাদের মদ্যপান আর গায়িকা দাসী রাখা। তখন মাহদী মাথা নিচু করে ফেললেন, এবং শারীক তাঁর নিকট থেকে বের হয়ে গেলেন।[11]‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ১৩/৫৪৩-৫৪৪

وقد ذكر له عن شريك بن عبد الله القاضي أنه لا يرى الصلاة خلفه، فأحضره إليه فتكلم معه، ثم قال له المهدي في كلام: يا ابن الزانية. فقال: مه مه يا أمير المؤمنين، فلقد كانت صوامة قوامة. فقال له: يا زنديق لأقتلنك. فضحك شريك، وقال: يا أمير المؤمنين، إن للزنادقة علامات يعرفون بها; شربهم القهوات، واتخاذهم القينات. فأطرق المهدي، وخرج شريك من بين يديه.

«البداية والنهاية» 13/ 543-544

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্বাযী শারিক নিজে মাহদির পেছনে নামাজ পড়া বৈধ মনে করতেন না, তবু তাঁকে “হে আমিরুল মুমিনীন” বলে সম্বোধন করেছেন। শাসকের অবস্থার সাথে উপাধির সম্পর্ক নেই, কর্তৃত্বের বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক আছে।

ইবনে কাসির তাঁর ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ কিতাবে বলেছেন:

তারা বর্ণনা করেছেন যে, মাহদি কুফার এক ব্যক্তির রক্ত হালাল ঘোষণা করেছিলেন এবং যে তাঁকে ধরে আনবে তার জন্য এক লক্ষ দিরহাম পুরস্কার নির্ধারণ করেছিলেন। লোকটি ছদ্মবেশে বাগদাদে প্রবেশ করলো। একদিন সে বাগদাদের কোনো এক অলিতে ছিল, এমন সময় এক ব্যক্তি তার দেখা পেয়ে গেল। সে তার কাপড়ের গেরো ধরে চিৎকার করে বললো: এই সেই ব্যক্তি, যাকে আমিরুল মুমিনিন খুঁজছেন। লোকটি তার কাছ থেকে ছুটে পালাতে চাইলো কিন্তু পারলো না। তারা উভয়ে এই অবস্থায় রত, এমন সময় এক আমির তার জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা সহ আগমন করলেন, তিনি ছিলেন মা’ন ইবনে যায়িদা। লোকটি বললো: হে আবুল ওয়ালিদ, এ এক ভীত শরণার্থী। তিনি বললেন: দূর হও! তোমার সাথে তার কী সম্পর্ক? সে বললো: এই সেই ব্যক্তি যাকে আমিরুল মুমিনিন খুঁজছেন, একে ধরে আনলে লক্ষ দিরহাম মিলবে। মা’ন বললেন: দূর হও! তুমি কি জানো না যে আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি? তুমি একে ছেড়ে দাও। তারপর তিনি তাঁর কোনো এক গোলামকে নির্দেশ দিলেন, সে তাঁর ঘোড়া থেকে নেমে তাকে ঘোড়ায় বসালো এবং নিজের গৃহে নিয়ে গেল। আর সেই ব্যক্তি খলিফার দরজায় গিয়ে ঘটনা পৌঁছালো, সংবাদ মাহদির নিকট গেল। তিনি মা’ন ইবনে যায়িদাকে ডেকে পাঠালেন। মা’ন তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে সালাম দিলেন, কিন্তু মাহদি সালামের জবাব দিলেন না। বললেন: হে মা’ন, বিষয়টি কি এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যে তুমি আমার বিরুদ্ধে আশ্রয় দান করো? তিনি বললেন: হ্যাঁ। মাহদি বললেন: বেশ ভালো তো! তিনি বললেন: হ্যাঁ, আমি আপনার রাজত্বে চার হাজার মুসল্লিকে হত্যা করেছি, তার বিনিময়ে কি একজন ব্যক্তিকে আশ্রয় দিতে পারবো না?! তখন মাহদি চুপ করে গেলেন, তারপর তাঁর দিকে মাথা তুলে বললেন: তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমিও তাকে আশ্রয় দিলাম, হে মা’ন। মা’ন বললেন: হে আমিরুল মুমিনিন, লোকটি দুর্বল। মাহদি তার জন্য ত্রিশ হাজার দিরহামের নির্দেশ দিলেন। মা’ন বললেন: তার অপরাধ ভীষণ, আর খলিফাদের পুরস্কার প্রজাদের অপরাধের অনুপাতে হয়ে থাকে। তখন মাহদি তার জন্য এক লক্ষ দিরহামের নির্দেশ দিলেন। সেই অর্থ মা’নের সামনেই লোকটির জন্য বহন করা হলো। মা’ন তাকে বললেন: খলিফার জন্য দোয়া করো এবং ভবিষ্যতে তোমার নিয়ত পরিশুদ্ধ করো।[12]‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ১৩/৫৪৬

وذكروا أن المهدي كان قد أهدر دم رجل من أهل الكوفة وجعل لمن جاء به مائة ألف، فدخل الرجل بغداد متنكرا، فبينما هو يوما في بعض أزقة بغداد إذ لقيه رجل، فأخذ بمجامع ثوبه ونادى: هذا طلبة أمير المؤمنين. وجعل الرجل يريد أن ينفلت منه فلا يقدر، فبينا هما كذلك إذا أمير في موكبه قد أقبل وإذا هو معن بن زائدة، فقال الرجل: يا أبا الوليد، خائف مستجير. فقال: ويحك! ما لك وله؟ فقال هذا طلبة أمير المؤمنين، جعل لمن جاء به مائة ألف. قال معن: ويحك! أوما علمت أني قد أجرته؟ أرسله من يدك. ثم أمر بعض غلمانه فترجل وأركبه، وذهب به إلى منزله، وانطلق ذلك الرجل إلى باب الخليفة فأنهى إليه الخبر، فبلغ المهدي. فأرسل إلى معن بن زائدة فدخل عليه، فسلم فلم يرد المهدي. وقال: يا معن، أبلغ من أمرك أن تجير علي؟ قال: نعم. قال: ونعم أيضا. قال: نعم، قد قتلت في دولتكم أربعة آلاف مصل، أفلا يجار لي رجل واحد؟! فأطرق المهدي، ثم رفع رأسه إليه وقال: قد أجرنا من أجرت يا معن. فقال: يا أمير المؤمنين، إن الرجل ضعيف. فأمر له المهدي بثلاثين ألفا. فقال: إن جريمته عظيمة، وإن جوائز الخلفاء على قدر ذنوب الرعية. فأمر له بمائة ألف، فحملت بين يدي معن إلى الرجل، فقال له معن: ادع للخليفة وأصلح نيتك في المستقبل.

«البداية والنهاية» 13/ 546

এখানে মা’ন ইবন যায়িদা মাহদিকে “হে আমিরুল মুমিনীন” বলে সম্বোধন করছেন। মাহদি অন্যায়ভাবে এক ব্যক্তির রক্ত হালাল করেছিলেন, তবু সম্বোধন একই থেকেছে। সে আল্লাহর বিধান দিয়ে ফায়সালা না করে রক্ত হালাল করেছে অন্যায়ভাবে। তার উপাধি কি বাতিল হয়েছে?

আমিরুল মুমিনীন উপাধির উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা

আল কালকাশান্দি তাঁর ‘সুবহুল আ’শা ফি সিনা’আতিল ইনশা’ কিতাবে বলেছেন:

তিনি ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার উৎস নিয়ে মতভেদ আছে। আবু জাফর আন নাহহাস ‘সিনা’আতুল কিতাব’ গ্রন্থে আবু ওয়াবারাহর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, এ উপাধি লাভের কারণ ছিল এই যে, আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা মদ্যপানের শাস্তিতে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করতেন। তিনি বলেন, খালিদ আমাকে তাঁর খিলাফতকালে উমরের কাছে মদ্যপানের বেত্রাঘাতের বিধান জিজ্ঞাসার জন্য পাঠালেন। আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম: হে আমিরুল মুমিনিন, খালিদ আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করেছেন। তিনি বললেন: কী বিষয়ে? আমি বললাম: মানুষ শাস্তির ভয় পাচ্ছে না এবং মদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে, আপনি এ বিষয়ে কী অভিমত দেন? তখন উমর তাঁর আশেপাশের লোকদের বললেন: এ ব্যাপারে তোমাদের কী অভিমত? আলী বললেন: আমরা মনে করি, হে আমিরুল মুমিনিন, আশিটি বেত্রাঘাত। উমর তা গ্রহণ করলেন। এভাবেই আবু ওয়াবারাহ এবং পরে আলী ইবনে আবি তালিব প্রথম ব্যক্তি যাঁরা তাঁকে এ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। আবু হিলাল আল আসকারি তাঁর ‘আল আওয়াইল’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এর আসল কারণ এই যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইরাকের নিজ গভর্নরের নিকট দূত পাঠালেন যেন তিনি ইরাকের অবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ দুজন লোক পাঠিয়ে দেন, যাঁদের তিনি তাঁর ইচ্ছা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তখন গভর্নর তাঁর নিকট লবিদ ইবনে রাবিয়াহ ও আদি ইবনে হিশাম কে প্রেরণ করলেন। তাঁরা যখন মদিনায় পৌঁছলেন, মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং আমর ইবনুল আসকে পেলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন: আমাদের জন্য আমিরুল মুমিনিনের নিকট সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করুন। আমর তাঁদের বললেন: তোমরা তাঁর উপযুক্ত নামই বলেছ! তারপর তিনি উমরের নিকট গিয়ে বললেন: ‘আমিরুল মুমিনিনের’ ওপর সালাম। উমর বললেন: হে ইবনুল আস, তোমার কী হল? এ কথা থেকে বের হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করবে! তখন তিনি তাঁকে ঘটনা বর্ণনা করলেন এবং উমর তা অনুমোদন করলেন। আর এটাই ছিল ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার প্রথম ঘটনা। তারপর এ উপাধি তাঁর পরে যিনিই খিলাফত লাভ করেছেন বা দাবি করেছেন, সবার জন্যই নির্ধারিত হয়ে গেল, তবে আন্দালুসের উমাইয়া খলিফারা ব্যতিক্রম। কারণ তাঁরা কেবল ‘আমির’ উপাধিতেই সম্বোধিত হতেন। অবশেষে তাঁদের মধ্য থেকে আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান, যিনি তাঁদের ত্রয়োদশতম খলিফা, তিনি আমাদের কাল পর্যন্ত খিলাফত উপাধি গ্রহণ করলেন।[13]সুবহুল আ’শা ফি সিনা’আতিল ইনশা, ৫/৪৪৬

واختلف في أصل تلقيبه بأمير المؤمنين فروى أبو جعفر النحاس في «صناعة الكتاب» بسنده إلى أبي وبرة، أن أصل تلقيبه بذلك أن أبا بكر وعمر رضي الله عنهما كانا يجلدان في الشراب أربعين، قال فبعثني خالد إلى عمر في خلافته أسأله عن الجلد في الشراب فجئته، فقلت: يا أمير المؤمنين إن خالدا بعثني إليك- قال فيم؟ قلت: إن الناس قد تخافوا العقوبة وانهمكوا في الخمر فما ترى في ذلك فقال عمر لمن حوله ما ترون في ذلك فقال علي نرى يا أمير المؤمنين ثمانين جلدة فقبل ذلك عمر فكان أبو وبرة ثم علي بن أبي طالب أول من لقبه بذلك. وذكر أبو هلال العسكري في كتابه «الأوائل» أن أصل ذلك أن عمر رضي الله عنه بعث إلى عامله بالعراق أن يرسل إليه رجلين عارفين بأمور العراق يسألهما عما يريد فأنفذ إليه لبيد بن ربيعة وعدي بن هشام «1» فلما وصلا المدينة دخلا المسجد فوجدا عمرو بن العاص فقالا له: استأذن لنا على أمير المؤمنين- فقال لهما عمرو: أنتما أصبتما اسمه! ثم دخل على عمر فقال السلام على «أمير المؤمنين» – فقال: ما بدا لك يا ابن العاص؟ لتخرجن من هذا القول! فقص عليه القصة فأقره على ذلك، فكان ذلك أول تلقيبه بأمير المؤمنين، ثم استقر ذلك لقبا على كل من ولي الخلافة بعده أو ادعاها خلا خلفاء بني أمية بالأندلس فإنهم كانوا يخاطبون بالإمارة فقط إلى أن ولي منهم عبد الرحمن بن محمد بن عبد الله «2» ، ابن عبد الرحمن، وهو الثالث عشر من خلفائهم إلى زماننا.

«صبح الأعشى في صناعة الإنشا – ط العلمية» 5/ 446

লক্ষ্য করুন: তিনি বলছেন: ذلك أول تلقيبه بأمير المؤمنين، ثم استقر ذلك لقبا على كل من ولي الخلافة بعده أو ادعاها خلا خلفاء بني أمية بالأندلس فإنهم كانوا يخاطبون بالإمارة আর এটাই ছিল ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার প্রথম ঘটনা। তারপর এ উপাধি তাঁর পরে যিনিই খিলাফত লাভ করেছেন বা দাবি করেছেন, সবার জন্যই নির্ধারিত হয়ে গেল, তবে আন্দালুসের উমাইয়া খলিফারা ব্যতিক্রম। কারণ তাঁরা কেবল ‘আমির’ উপাধিতেই সম্বোধিত হতেন।

তো আমরা সাড়ে চৌদ্দশো বছরের ইতিহাসে খুলাফায়ে রাশেদীন এর পর আব্বাসীয় বা বনু উমাইয়্যাহদের কোন শাসককে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী প্রতিটি ক্ষেত্রে ফায়সালা করতে দেখি? কেউ ভুলবশত, কেউ প্রবৃত্তির দরুণ ফায়সালা করেনি। তাদের কারো আমীরুল মুমিনীন উপাধি বাতিল হয়েছে বলে কেউ দাবি করেনি।

কর্তৃত্বহীন শাসকও “আমিরুল মুমিনীন”

ইবনে তাগরিবিরদি তাঁর ‘মাওরিদুল লাতাফা ফি মান ওয়ালিয়াস সালতানা ওয়াল খিলাফা’ কিতাবে বলেছেন:

ইবনে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ইবনুল হাকাম, আমিরুল মুমিনিন, আবু ইসহাক, আল উমাবি আল কুরাশি আদ দিমাশকি। তিনি ‘আল মুতায বিল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। তাঁর মা ছিলেন এক উম্মে ওয়ালাদ। তাঁর ভাই ইয়াজিদ আন নাকিসের মৃত্যুর পর তাঁর খিলাফতের বাইআত গ্রহণ করা হয়, কিন্তু তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং কেউ তাঁর আনুগত্য করেনি। সেনাদল তাঁর বিরুদ্ধে মতবিরোধ করে। তারপর মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদ আল হিমার তাঁর উপর বিজয়ী হন এবং তাঁদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় যা মারওয়ান আল হিমারের জয় ও ইব্রাহিম ইবনুল ওয়ালিদের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। ইব্রাহিম আল জাজিরা অভিমুখে রওনা হন এবং একশত সাতাশ হিজরি সালে তিনি সেখানে ডুবে মারা যান। তাঁর খিলাফতের স্থায়িত্ব ছিল দুই মাস দশ দিন। তাঁর পরে মারওয়ান খিলাফতে অধিষ্ঠিত হন।[14]মাওরিদুল লাতাফা ফি মান ওয়ালিয়াস সালতানা ওয়াল খিলাফা, ১/১০৯

ابن عبد الملك بن مروان بن الحكم ‌أمير ‌المؤمنين، أبو إسحاق، الأموي القرشي الدمشقي. ‌لقب بالمعتز بالله. وأمه أم ولد. بويع بالخلافة بعد موت أخيه يزيد الناقص؛ فلم يتم أمره ولا أطاعه أحد. واختلف عليه الجند. ثم تغلب عليه مروان بن محمد الحمار، ووقع بينهما حروب آلت إلى نصرة مروان [الحمار] وهزيمة إبراهيم [بن الوليد] . وتوجه إبراهيم إلى الجزيرة؛ فمات بها غريقا في سنة سبع وعشرين ومائة؛ فكانت خلافته شهرين وعشرة أيام. واستقر [مروان] بعده في الخلافة.

«مورد اللطافة في من ولي السلطنة والخلافة» 1/ 109

ইব্রাহিম ইবনুল ওয়ালিদকে “আমিরুল মুমিনীন” বলা হয়েছে, অথচ তার ব্যাপারে স্পষ্ট বলা আছে “কেউ তার আনুগত্য করেনি” এবং তার কর্তৃত্বই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ কার্যকর শাসনক্ষমতা না থাকলেও উপাধি বহাল থেকেছে। এটি প্রমাণ করে যে “আমিরুল মুমিনীন” উপাধি শাসকের ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভর করে না।

আব্বাসি খলিফার স্বীকৃতি

জালালুদ্দিন আস সুয়ুতী তাঁর ‘হুসনুল মুহাযারা ফি তারিখি মিসর ওয়াল কাহিরা’ কিতাবে বলেছেন:

খলিফা মুস্তাযী চারাত্তর হিজরিতে তাঁর নিকট অত্যন্ত জাঁকালো খিলআত প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর উপাধির সঙ্গে ‘মুইযযু আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি যোগ করেছিলেন। অতঃপর খলিফা নাসির যখন ছিয়াত্তর হিজরিতে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন তাঁকে পদে বহাল রাখার খিলআত প্রেরণ করলেন। তারপর বিয়াশি হিজরিতে তিনি এই বলে ভর্ৎসনা পাঠালেন যে, তিনি ‘আল মালিক আন নাসির’ উপাধি ধারণ করছেন, অথচ তিনি তো ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধিতে ভূষিত। প্রত্যুত্তরে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করে জানালেন যে, এ উপাধি তো খলিফা মুস্তাযীর আমলের, আর আমীরুল মুমিনীন যদি কোনো উপাধিতে ভূষিত করেন, তাহলে তিনি তা থেকে সরেন না; এবং তিনি খলিফার সাথে পরম আদব প্রদর্শন করলেন।[15]হুসনুল মুহাযারা ফি তারিখি মিসর ওয়াল কাহিরা, ২/২০

وقد كان الخليفة المستضيء أرسل إليه في سنة أربع وسبعين خلعا سنية جدا، وزاد في ألقابه “معز ‌أمير ‌المؤمنين”. ثم لما ولي الخليفة الناصر في سنة ست وسبعين أرسل إليه خلعة الاستمرار، ثم أرسل إليه في سنة اثنتين وثمانين يعاتبه في تلقيبه بالملك الناصر، مع أنه ‌لقب ‌أمير ‌المؤمنين، فأرسل يعتذر إليه بأن ذلك كان من أيام الخليفة المستضيء، وأنه إن لقبه ‌أمير ‌المؤمنين بلقب، فهو لا يعدل عنه، وتأدب مع الخليفة غاية الأدب.

«حسن المحاضرة في تاريخ مصر والقاهرة» 2/ 20

সুয়ুতীর বর্ণনায় আব্বাসি খলিফা নিজে মিশরের সুলতানকে “মুইযযু আমীরুল মুমিনীন” উপাধি দিয়েছেন। এই সুলতান কি পূর্ণ শরঈ রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন? না। তবু খলিফা নিজেই এই উপাধি দিলেন এবং পরে অন্য উপাধি ব্যবহার করায় ভর্ৎসনাও পাঠালেন। এটি প্রমাণ করে যে “আমিরুল মুমিনীন” সংশ্লিষ্ট উপাধি পাওয়ার শর্ত হলো কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকা, আল্লাহর বিধান সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা নয়।

এবার আসি আন্দালুসের ইতিহাস থেকে।

আন্দালুসের উমাইয়া আমিরদের ঘটনা

ডক্টর মুহাম্মদ খালদুন আহমদ নূরস মালিকি তাঁর ‘তাআদ্দুদুল খুলাফা ওয়া ওয়াহদাতুল উম্মাহ ফিকহান ওয়া তারিখান ওয়া মুস্তাকবালান’ কিতাবে বলেছেন:

তার প্রতি শত্রুতা পোষণ এবং তাকে হত্যা ও তার থেকে মুক্তি পাওয়ার ষড়যন্ত্র করায় তিনি খুতবায় আব্বাসি খলিফার জন্য দোয়া বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু নিজ শাসনামলে তিনি খিলাফতের উপাধি গ্রহণ করেননি, যাতে আশপাশের মুসলমানদের অনুভূতি আহত না হয়। তিনি নিজের জন্য ‘আমির’ উপাধিই ব্যবহার করতেন এবং খিলাফতের সন্তান উমাইয়া আমিরদের জন্য দোয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীকালে উমাইয়া আমিরগণ আন্দালুসের শাসনভার নিজেদের মধ্যে আবর্তিত করেন এবং তারাও খলিফা বা ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধি নেননি; বরং খিলাফতের উপাধির প্রতি সমীহ দেখিয়ে তাঁরা ‘খোলাফায়ে সাবেকিনের সন্তান’ বা ‘আবনাউল খালায়িফ’ উপাধিতেই সন্তুষ্ট থেকেছেন। এর ভিত্তি ছিল তাঁদের পূর্বপুরুষদের পূর্বতন উমাইয়া খিলাফত। আন্দালুসবাসী আমিরকে এই বলে সালাম জানাত: ‘হে খোলাফায়ে সাবেকিনের সন্তান, আপনার ওপর সালাম।'[16]‘তাআদ্দুদুল খুলাফা ওয়া ওয়াহদাতুল উম্মাহ’ পৃ. ৩০১

قال حميد بن زنجويه: يريد أن الخلافة حق، الخلافة إنما هي للذين صدقوا هذا الاسم بأعمالهم، وتمسكوا بسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم من بعده، فإذا خالفوا السنة، وبدلوا السيرة، فهم حينئذ ملوك، وإن كانت أساميهم الخلفاء، ‌ولا ‌بأس ‌أن ‌يسمى ‌القائم ‌بأمور ‌المسلمين: أمير المؤمنين والخلفاء، وإن كان مخالفا لبعض سير أئمة العدل لقيامه بأمر المؤمنين وسمع المؤمنين له، ويسمى خليفة، لأنه خلف الماضي قبله، وقام مقامه، ولا يسمى أحد خليفة الله بعد آدم وداود عليهما السلام، قال الله سبحانه وتعالى: {إني جاعل في الأرض خليفة} [البقرة: 30]، وقال: {يا داود إنا جعلناك خليفة في الأرض} [ص: 26].

আন্দালুসের উমাইয়া আমিররা প্রথমে “আমিরুল মুমিনীন” উপাধি নেননি। তারা “আমির” উপাধিতেই সম্বোধিত হতেন। কিন্তু এটি ছিল রাজনৈতিক বিনয়, অর্থাৎ বাগদাদের খলিফার প্রতি সমীহ। এটি কোনো শরঈ বিধান ছিল না যে ফাসিক হওয়ার কারণে তারা “আমিরুল মুমিনীন” হতে পারবেন না।

সিবত ইবনুল জাওযি তাঁর ‘মিরআতুজ জামান ফি তাওয়ারিখিল আ’ইয়ান’ কিতাবে বলেছেন:

ولي سنة ثلاث مئة لما مات جده لأبيه عبد الله بن محمد بن عبد الرحمن، وله ألقاب منها: الناصر لدين الله، ‌أمير ‌المؤمنين، وهو أول من ‌لقب نفسه بالناصر، وبأمير المؤمنين بالأندلس، وكانوا قبله يسمون بني الخلائف ويسلم عليهم بالإمرة، فلما ضعف أمر الخلافة ببغداد في أيام المقتدر وغيرها تلقب بنو أمية بإمرة المؤمنين، وكذا بنو عبيد الله بالقيروان والمهدية، وتلقب عبد الرحمن بالقمر الأزهر، والأسد الغضنفر، وأمه أم ولد يقال لها: مزنة. وكان شجاعا، شهما، محمود السيرة، ميمون النقيبة، لم يزل يستأصل المتغلبين حتى تم أمره بالأندلس، فأقام واليا خمسين سنة، ولم يبلغ أحد من بني أمية هذه المدة.

তিনি তিন শত হিজরিতে, যখন তাঁর পিতামহ আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান মারা যান, তখন শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর উপাধিসমূহের মধ্যে ছিল আন নাসিরু লিদীনিল্লাহ, আমিরুল মুমিনিন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আন্দালুসে নিজেকে আন নাসির ও আমিরুল মুমিনিন উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর পূর্বে তাঁদেরকে বনুল খালায়িফ বলা হতো এবং আমির হিসেবে তাদের সালাম জানানো হতো। অতঃপর যখন বাগদাদের খিলাফতের কর্তৃত্ব মুকতাদির ও অন্যান্যদের আমলে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বনু উমাইয়া আমিরুল মুমিনিন উপাধি গ্রহণ করেন।[17]‘মিরআতুজ জামান ফি তাওয়ারিখিল আ’ইয়ান’ ১৭/৩৩৩

আন্দালুসের শাসকরা “আমির” থেকে “আমিরুল মুমিনীন” উপাধিতে গেলেন কেন? কারণ বাগদাদের খিলাফত দুর্বল হয়ে পড়েছিল, অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে “আমির” ও “আমিরুল মুমিনীন” আলাদা কোনো শরঈ শ্রেণি নয়, এবং শাসকের ধার্মিকতার সাথে এই পার্থক্যের কোনো সম্পর্ক নেই।

মিশরের সর্বোচ্চ ইসলামী গবেষণা কাউন্সিলের বক্তব্য

মিশরের সর্বোচ্চ ইসলামী গবেষণা কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত ‘মাউসু’আতুল মাফাহীমিল ইসলামিয়্যা আল আম্মা’য় বলা হয়েছে:

যাই হোক না কেন, এ উপাধিটি হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগ থেকে উসমানি যুগ পর্যন্ত ব্যবহৃত হতে থাকে, পাশাপাশি পরবর্তীকালে সুলতান ও বাদশাহরা আরও যেসব উপাধি ব্যবহার করেছিলেন তাও চালু ছিল।[18]‘মাউসু’আতুল মাফাহীমিল ইসলামিয়্যা আল আম্মা’ পৃ. ৫৫

ومهما يكن من أمر فقد استمر اللقب مستخدما منذ عهد عمر رضى الله عنه حتى العصر العثمانى

উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে উসমানি যুগ পর্যন্ত এই দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য ফাসিক শাসক এসেছেন। কিন্তু “আমিরুল মুমিনীন” উপাধি কখনো বন্ধ হয়নি। এটিই প্রমাণ করে যে উপাধিটি শাসকের ব্যক্তিগত ফিসক দ্বারা বাতিল হয় না।

সারসংক্ষেপ: কেন আবু বকর জাকারিয়ার বক্তব্য ইলমিভাবে ভিত্তিহীন

জাকারিয়ার দাবি ছিল, ফাসিক শাসক “আমিরুল মুমিনীন” হতে পারে না। কিন্তু ইমাম নববী ও বাগাভি সরাসরি বলেছেন ফাসিক হলেও “আমিরুল মুমিনীন” বলা হবে। ওয়ালিদ ইবন ইয়াজিদ ও তার মতো ফাসিক শাসকদের আলিমরা “আমিরুল মুমিনীন” বলেই উল্লেখ করেছেন, যারা অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান দিয়ে ফায়সালা করেননি। মাউসুআতুল ইজমা ও মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিতাব অনুযায়ী ইমাম, খলিফা ও আমিরুল মুমিনীন সমার্থক, এদের মধ্যে “রাষ্ট্রপ্রধান” নামের কোনো চতুর্থ শ্রেণি শরিয়তের পরিভাষায় নেই। সুতরাং যাকারিয়ার এই বক্তব্য ইলমি দৃষ্টিকোণ থেকে ভিত্তিহীন।


লেখাঃ সাফিন চৌধুরী

References

References
1«মিনহাজুস সুন্নাহ আন নববীয়া» ৫/১৩০
2‘রাউদাতুত তালিবিন ওয়া উমদাতুল মুফতিন’ ১০/৪৯
3‘শারহুস সুন্নাহ’ বাগাভি ১৪/৭৫
4‘আত তা’রীফাতুল ফিকহিয়্যা’ পৃ. ৩৬
5‘মাউসু’আতুল ইজমা’ – আল ফাদিলা ৫/৫১
6‘আস সিয়াসাতুশ শারইয়্যা, জামিআতুল মদিনা’ পৃ. ৪৬৪
7‘শারহুল আরবাঈন আন নববীয়া, আল আব্বাদ’ ১/৫
8‘ফাওয়াতুল ওয়াফিয়াত’ ৪/২৫৬-২৫৭
9‘ফাওয়াতুল ওয়াফিয়াত’ ৪/২৫৮-২৫৭
10‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ১৩/৫৪০
11‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ১৩/৫৪৩-৫৪৪
12‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ১৩/৫৪৬
13সুবহুল আ’শা ফি সিনা’আতিল ইনশা, ৫/৪৪৬
14মাওরিদুল লাতাফা ফি মান ওয়ালিয়াস সালতানা ওয়াল খিলাফা, ১/১০৯
15হুসনুল মুহাযারা ফি তারিখি মিসর ওয়াল কাহিরা, ২/২০
16‘তাআদ্দুদুল খুলাফা ওয়া ওয়াহদাতুল উম্মাহ’ পৃ. ৩০১
17‘মিরআতুজ জামান ফি তাওয়ারিখিল আ’ইয়ান’ ১৭/৩৩৩
18‘মাউসু’আতুল মাফাহীমিল ইসলামিয়্যা আল আম্মা’ পৃ. ৫৫

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


Back to top button