রদ্দ ও খণ্ডন

“আল্লাহকে সিজদাহ করি” এই কথা বলা কি বৈধ নয়?

আবু বকর জাকারিয়ার বিভ্রান্তি

“আল্লাহকে সিজদাহ করি” — এটা কি কুরআন ও হাদিসের কথা নয়?

হিযবী আবু বকর জাকারিয়া দাবি করেছে যে “আল্লাহকে সিজদা করি” এটা কুরআন ও হাদিসের কথা নয়। তিনি বলেছেন আমরা আল্লাহর জন্য সিজদাহ করি, আল্লাহকে নয়। এবং যে মনে করে আল্লাহর সত্তা বা পা বা কুদরতি পায়ে সিজদাহ করে সে কাফির।

play-sharp-fill
আমরা আল্লাহর জন্য সিজদাহ করি, আল্লাহকে নয় – এই দাবিটি আরবি ব্যাকরণ (নাহু) এবং স্বয়ং কুরআনের ভাষার সাথে সাংঘর্ষিক।

প্রথমে একটু আরবি ব্যাকরণ বুঝতে হবে

আরবি ব্যাকরণে ক্রিয়া (فِعل) দুই প্রকার। এক প্রকার হলো সেই ক্রিয়া যা নিজে নিজেই সম্পূর্ণ, এর পরে “কাকে?” বা “কী?” জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হয় না। যেমন বাংলায় “সে ঘুমালো” — ব্যস, বাক্য সম্পূর্ণ। আরবিতে এই ধরনের ক্রিয়াকে বলে لازِم (লাযিম) অর্থাৎ অকর্মক ক্রিয়া।

আরেক প্রকার হলো সেই ক্রিয়া যা একা একা সম্পূর্ণ হয় না, এর পরে “কাকে?” বা “কী?” বলতে হয়। যেমন “সে খেলো” — খেলো কী? উত্তর দিতে হবে। আরবিতে এই ধরনের ক্রিয়াকে বলে مُتَعَدٍّ (মুতাআদ্দী) অর্থাৎ সকর্মক ক্রিয়া।
এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিছু ক্রিয়া আছে যেগুলো মূলত লাযিম (অকর্মক), কিন্তু একটি নির্দিষ্ট হারফ জার (حَرف جَرّ)-এর মাধ্যমে কর্মের সাথে যুক্ত হয়। এই হারফ জারকে বলা হয় صِلَة الفِعل (সিলাতুল ফিয়ল) অর্থাৎ ক্রিয়ার সেতু বা যোগসূত্র। আর এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় تَعْدِيَة (তাআদ্দিয়া) অর্থাৎ অকর্মক ক্রিয়াকে সকর্মক বানানো।

বাংলায় একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। “যাওয়া” ক্রিয়াটি অকর্মক। “সে গেলো” — সম্পূর্ণ বাক্য। কিন্তু আপনি যদি বলতে চান কোথায় গেলো, তাহলে বলবেন “সে বাজারে গেলো” — মাঝখানে “এ” লাগলো। আপনি “সে বাজার গেলো” বলতে পারবেন না। এই “এ” হলো সেতু। আরবিতেও ঠিক এভাবেই لِ, بِ, إلى ইত্যাদি হারফ জার সেতু হিসেবে কাজ করে।

ইমাম ইবনু মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর আলফিয়্যাহতে এই নিয়মটি সূত্রাকারে বলেছেন: وَعَدِّ لازِماً بِحَرفِ جَرّ — “লাযিম ক্রিয়াকে হারফ জার দিয়ে মুতাআদ্দী করো।” শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর শরহু আলফিয়্যাহতে এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে লাযিম ক্রিয়া নিজে মাফউল বিহি (কর্ম) নসব করতে পারে না, বরং তাকে উপযুক্ত হারফ জার দিয়ে মুতাআদ্দী করতে হয়। তিনি উদাহরণ দিয়েছেন: فَرِحَ زَيدٌ (যায়দ খুশি হলো) — এটি লাযিম। কিন্তু যখন বলবেন কিসে খুশি হলো, তখন বলতে হবে فَرِحَ زَيدٌ بِالنَّجاحِ (যায়দ সাফল্যে খুশি হলো) — بِ সেতু হিসেবে কাজ করলো। (শরহু আলফিয়্যাতি ইবনি মালিক, শামেলা: shamela.ws/book/36954/337)

ইবনু ইয়াঈশ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর শরহুল মুফাস্সালে “تعدية الفعل اللازم” (লাযিম ক্রিয়ার তাআদ্দিয়া) শিরোনামে পূর্ণ একটি অধ্যায় রেখেছেন যেখানে এই বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। (shamela.ws/book/13301/1663)

কিতাবুল লামাত-এ لام الاستحقاق অধ্যায়ে বলা হয়েছে: ولام الملك والاستحقاق جميعا من صلة فعل أو معناه لا بد من ذلك، وكذلك سائر حروف الخفض كلها صلات لأفعال — অর্থাৎ লামুল মিলক ও লামুল ইসতিহকাক উভয়ই কোনো না কোনো ক্রিয়ার সিলাহ (সেতু), এবং সকল হারফ জারই মূলত ক্রিয়ার সিলাত। (shamela.ws/book/6966/35)

এখন মূল প্রশ্নে আসা যাক — سَجَدَ لِلَّهِ তে لِ কী অর্থে?
সাজাদা : سَجَدَ (সিজদাহ করা) ক্রিয়াটি لازِم (অকর্মক)। “সে সিজদাহ করলো” — সম্পূর্ণ বাক্য। কিন্তু কাকে সিজদাহ করলো বলতে হলে سَجَدَ ক্রিয়া নিজে সরাসরি কর্ম নিতে পারে না। তাকে لِ সেতু দিয়ে কর্মের সাথে যুক্ত হতে হয়। তাই কুরআনে এসেছে سَجَدَ لِلَّهِ। এখানে لِ হলো সিলাতুল ফিয়ল (ক্রিয়ার সেতু), এবং এর অনুবাদ হবে “আল্লাহকে সিজদাহ করলো।”

কুরআনের যেসব আয়াতে سَجَدَ لِلَّهِ এসেছে:

(১) فَاسْجُدُوا لِلَّهِ وَاعْبُدُوا — “আল্লাহকে সিজদাহ করো এবং তাঁর ইবাদত করো।” (সূরা নাজম ৫৩:৬২)
(২) وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ — “আল্লাহকে সিজদাহ করে যা আসমানসমূহে ও যমীনে আছে।” (সূরা নাহল ১৬:৪৯)
(৩) وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ — “আল্লাহকে সিজদাহ করে যারা আসমানসমূহে ও যমীনে আছে।” (সূরা রা’দ ১৩:১৫)

(৪) أَلَّا يَسْجُدُوا لِلَّهِ — “তারা আল্লাহকে সিজদাহ করে না।” (সূরা নামল ২৭:২৫)

এটা যে শুধু সিজদাহর ক্ষেত্রে নয়, কুরআনেই لِ “কে” অর্থে এসেছে

আল্লাহ তাআলা বলেছেন: أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ — “আমাকে শোকর করো এবং তোমার পিতামাতাকে।” (সূরা লুকমান ৩১:১৪)। এখানে لِي মানে “আমাকে”, “আমার জন্য” নয়। কারণ شَكَرَ (শোকর করা) ক্রিয়া لِ দিয়ে মুতাআদ্দী হয়। কেউ যদি এই আয়াতের অনুবাদ করেন “আমার জন্য শোকর করো” তাহলে অর্থ গোলমেলে হয়ে যায়, কারণ শোকর তো কাউকে করা হয়, কারো “জন্য” করা হয় না।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন: نَصَحْتُ لَكُمْ — “তোমাদেরকে নসীহত করেছি।” (সূরা আ’রাফ ৭:৭৯)। এখানে لَكُمْ মানে “তোমাদেরকে”।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন: وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ — “তাদেরকে তাদের নবী বললেন।” (সূরা বাকারা ২:২৪৭)। এখানেও لَهُمْ মানে “তাদেরকে”।

হাদিসে এসেছে: الدِّينُ النَّصِيحَةُ، قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ — “দ্বীন হলো নসীহত। আমরা বললাম: কার জন্য? তিনি বললেন: আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য।” (সহীহ মুসলিম)। এই হাদিসে لِمَنْ প্রশ্নটি “কাকে?” অর্থেও আসতে পারে, কারণ نَصَحَ ক্রিয়া لِ দিয়ে মুতাআদ্দী হয়। ইবনু রজব আল-হাম্বালী জামিউল উলূম ওয়াল হিকামে এই لِ-কে ক্রিয়ার সিলাহ বলেছেন এবং কুরআনের نَصَحْتُ لَكُمْ আয়াত দিয়ে দলীল দিয়েছেন।

আবু বকর জাকারিয়্যার গলদ কোথায়?

প্রথমত, তিনি দাবি করেছেন “আল্লাহকে সিজদা করি এটা কুরআন ও হাদিসের কথা নয়”। অথচ কুরআনে سَجَدَ لِلَّهِ একাধিক আয়াতে এসেছে, এবং আরবি ব্যাকরণের সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী এখানে لِ তাআদ্দিয়া (সেতু) হিসেবে আসতে পারে, যার অনুবাদ হবে “আল্লাহকে সিজদাহ করা।” কুরআনেই اشْكُرْ لِي (আমাকে শোকর করো — সূরা লুকমান ৩১:১৪) আয়াত আছে যেখানে لِ স্পষ্টভাবে “কে” অর্থে ব্যবহৃত। একই ব্যাকরণিক নিয়মে اسْجُدُوا لِلَّهِ অর্থ হবে “আল্লাহকে সিজদাহ করো।”

দ্বিতীয়ত, তিনি لِ হারফ জারের শুধুমাত্র একটি অর্থ (“জন্য”) ধরে নিয়েছেন এবং বাকি অর্থগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন। অথচ আরবি ব্যাকরণবিদগণ لِ-এর ত্রিশটিরও বেশি অর্থ উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে المِلك (মালিকানা), الاختصاص (নির্দিষ্টতা), التعليل (কারণ), التعدية (সেতু/তাআদ্দিয়া), التبليغ (পৌঁছানো) ইত্যাদি রয়েছে। কোন আয়াতে لِ কোন অর্থে এসেছে সেটা নির্ধারণ হয় ক্রিয়ার ধরন ও প্রসঙ্গ (سِياق) দেখে — শুধু একটা অর্থ ধরে নিয়ে বাকিগুলো বাতিল করে দেওয়া নাহুর নীতিবিরুদ্ধ।

তৃতীয়ত, তিনি “আল্লাহকে সিজদাহ করা” কথাটাকে “আল্লাহর সত্তায় বা পায়ে সিজদাহ করা”-র সাথে মিলিয়ে ফেলেছেন। এটা একটা ভুল সমীকরণ। “আল্লাহকে সিজদাহ করি” মানে সিজদাহর লক্ষ্য আল্লাহ, ঠিক যেমন “আল্লাহকে ভয় করি” মানে ভয়ের লক্ষ্য আল্লাহ — এর মানে এই নয় যে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছি। “আল্লাহকে ডাকি” মানে ডাকের লক্ষ্য আল্লাহ — এর মানে এই নয় যে আল্লাহর কাছে বাস্তবিকভাবে গিয়েই ডাকছি। বাংলা ভাষায় “কে” দিয়ে ক্রিয়ার লক্ষ্য বোঝানো হয়, শারীরিক স্পর্শ বা সংযুক্তি বোঝানো হয় না। কাজেই “আল্লাহকে সিজদাহ করি” থেকে কেউ যদি বোঝে যে আল্লাহর সত্তায় বা পায়ে সিজদাহ দেওয়া হচ্ছে, তাহলে সমস্যা কথায় নয়, ঐ ব্যক্তির বোঝাপড়ায়।

চতুর্থত, আকীদার দিক থেকেও এই কথায় কোনো সমস্যা নেই। আল্লাহ আরশের উপর, সিজদাহ মাটিতে হয় — এটা সঠিক। কিন্তু “আল্লাহকে সিজদাহ করি” মানে হলো সিজদাহ নামক ইবাদতটি আল্লাহর দিকে পরিচালিত, তিনিই এর مَسجود لَه (যাঁকে সিজদাহ করা হচ্ছে)। আর “আল্লাহর জন্য সিজদাহ করি” মানে হলো সিজদাহটি একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত (ইখলাস)। দুটোই সঠিক, দুটো ভিন্ন দিক, এবং কুরআনের ভাষা দুটো অর্থই ধারণ করে।

কাজেই আবু বকর জাকারিয়্যার দাবি যে “আল্লাহকে সিজদা করি এটা কুরআন ও হাদিসের কথা নয়” — এটি কুরআনের ভাষা, আরবি ব্যাকরণের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি এবং নাহুবিদ ইমামদের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক একটি ভুল দাবি।

লেখাঃ সাফিন চৌধুরী

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


Back to top button