উলামাদের ফতোয়া সমগ্রফিকহ

চার মাযহাবের তাক্বলীদের বিধান এবং সাধারণ মানুষের করণীয়

চার মাযহাবের তাক্বলীদের বিধান সমন্ধে শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সলেহ আল উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)

শাইখ মুহাম্মদ বিন স্বলেহ আল উছাইমীন (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:

চার মাযহাবের কোনো একটি মাযহাবের তাক্বলীদ করার বিধান কী?

তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) উত্তরে বলেন:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বের রব। দরূদ ও সালাম পেশ করছি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গ, সাহাবায়ে কেরামের উপর এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদেরকে উত্তমরূপে অনুসরণকারীদের উপর।

জবাব:
মাযহাবের সাথে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে মানুষকে কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়:

প্রথম শ্রেণী:
যারা এ ধারণা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসারী হয় যে, এটি অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় সঠিকতার নিকটতর। কিন্তু সত্য সুস্পষ্ট হলে সে তা গ্রহণ করে এবং নিজের অনুসৃত মাযহাবের বিপরীত হলেও ত্যাগ করে। এতে কোনো দোষ নেই। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতো মহান আলিমগণও এমনটি করেছেন। তিনি তথা ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) – এর মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং হাম্বলী মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হতেন। কিন্তু আমরা তাঁর কিতাব ও ফতোয়ায় দেখি, যখনই কোনো দলীল তাঁর নিকট স্পষ্ট হতো, তিনি তা অনুসরণ করতেন, এমনকি মাযহাবের প্রচলিত মতের বিপরীতে যেতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। তিনি প্রায়শই এমন করেছেন। এ ধরনের অনুসরণে সমস্যা নেই। কারণ, কোনো মাযহাবের প্রতি সম্পৃক্ত হয়ে এর নীতিমালা ও উসূল অধ্যয়ন করা মানুষকে কুরআন-সুন্নাহ বুঝতে এবং চিন্তাধারাকে সুসংহত করতে সাহায্য করে।
.

দ্বিতীয় শ্রেণি:
যে ব্যক্তি কোনো মাযহাবের প্রতি মুতআছছিব (অন্ধভাবে গোঁড়ামি করে)। সে দলীল না দেখে শুধু নিজ মাযহাবের আযাঈম (শরঈ আবশ্যিক বিধান) ও রুখসত সংক্রান্ত সব বিধানসমূহই গ্রহণ করে। তার কাছে দলীল হলো শুধু তার মাযহাবের কিতাবসমূহ। যদি দলীল তার মাযহাবের কিতাবের বিপরীত প্রমাণিত হয়, তবুও সে দুর্বল তাবীল (অপব্যাখ্যা) দিয়ে তা মিলানোর চেষ্টা করে। এটা নিন্দনীয় এবং ঐসব লোকের সদৃশ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

“তুমি কি তাদের দেখনি যারা দাবি করে যে, তারা বিশ্বাস করে যা তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে? তারা তাগুতের কাছে মিমাংসা চায়, অথচ তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে। শয়তান তাদেরকে ঘোর পথভ্রষ্টতায় নিপতিত করতে চায়। (সূরা আন-নিসা ৬০)”

আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন এবং রাসূলের দিকে এসো,’ তখন তুমি মুনাফিকদেরকে দেখবে তারা তোমার থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নেয়।
যদিও এরা ঐ মুনাফিকদের মতো নয়, তবুও তাদের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। তারা মহাবিপদে রয়েছে। কারণ, কিয়ামতের দিন তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে: “তোমরা রাসূলদের ডাকে কী উত্তর দিয়েছিলে?” (সূরা আল-কাসাস ৬৫)। তখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে না যে: “অমুক কিতাব বা অমুক ইমামের উত্তর কী দিয়েছিলে?”

তৃতীয় শ্রেণী:
যে ব্যক্তির কোনো ইলম (জ্ঞান) নেই, সে সম্পূর্ণ সাধারণ ব্যক্তি (আম্মী)। সে একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করে, কারণ সে নিজে থেকে সত্য নির্ণয় করতে অক্ষম এবং ইজতিহাদের যোগ্যতাই তার নেই। এ ধরনের ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর অন্তর্ভুক্ত: “তোমরা যদি না জানো তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।” (সূরা আন-নাহল ৪৩)

এই প্রশ্নের সাথে আরেকটি প্রশ্ন জড়িত:
যদি কোনো সাধারণ ব্যক্তি কোনো আলিমের নিকট ফতোয়া জিজ্ঞাসা করে এবং পরে অন্য আলিমকে ভিন্ন মত দিতে শোনে, তাহলে কার কথা সে মানবে? সাধারণ ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়—একজনের মত মানবে নাকি অপরজনের? তার পক্ষে দলীলের ভিত্তিতে কোনো এক মতকে প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব হয় না। এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়: আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতীত দায়িত্ব দেন না। যদি একজনকে অধিক জ্ঞানী ও আল্লাহভীরু মনে হয়, তবে তার মত অনুসরণ করবে। যদি উভয়ে সমপর্যায়ের হন, তবে কেউ কেউ বলেন: সতর্কতামূলকভাবে অধিক কঠিন মত গ্রহণ করা উচিত। আবার কেউ বলেন: সহজতম মত নেওয়া উচিত, কারণ শরয়ী বিধানের মূলনীতি হলো ‘যিম্মা (দায়িত্ব) মুক্ত থাকা’। কেউ কেউ বলেন: খাইয়ারা (পছন্দ করার স্বাধীনতা) দেয়া যেতে পারে।

(শাইখের মতে) সঠিকতার নিকটতম মত হলো: সহজতম মত গ্রহণ করা। কারণ আল্লাহ তাআলার বাণী: “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।” (সূরা আল-বাকারাহ ১৮৫)

এক্ষেত্রে দলীলসমূহ সমতুল্য; কারণ ফাতওয়া প্রদানকারী উভয়জনই জিজ্ঞাসাকারীর দৃষ্টিতে সমমর্যাদার অধিকারী।

চার মাযহাবের তাক্বলীদের বিধান এবং সাধারণ মানুষের করণীয়

 

 

 

অনুবাদ: সাফিন চৌধুরী । Shafin Chowdhury

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


Back to top button